সপ্তাহের সেরা

    আখ্যাত রচনা

    কবিতাকেউ কথা রাখেনি

    কেউ কথা রাখেনি

    কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো কেউ কথা রাখেনি
    ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমি তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিলো
    শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে
    তারপর কত চন্দ্রভুক অমবস্যা এসে চলে গেল, কিন্তু সেই বোষ্টুমি আর এলো না
    পঁচিশ বছর প্রতীক্ষায় আছি।

    মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর
    তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো
    সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে!
    নাদের আলি, আমি আর কত বড় হবো? আমার মাথা এই ঘরের ছাদ
    ফুঁরে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায় তিন প্রহরের বিল দেখাবে?

    একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো
    লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্কর বাড়ির ছেলেরা
    ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি ভেতরে রাস উৎসব
    অবিরল রঙ্গের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পড়া ফর্সা রমণীরা কতরকম আমোদে হেসেছে
    আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি!
    বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন আমরাও…
    বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই
    সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি-লজেন্স, সেই রাস উৎসব
    আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবে না!

    বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল,
    যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে
    সেদিন আমার বুকেও এরকম আতরের গন্ধ হবে!
    ভালবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি
    দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়
    বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮ টি নীলপদ্ম
    তবু কথা রাখেনি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ
    এখনো সে যে কোন নারী!
    কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনা!

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪ - ২৩ অক্টোবর ২০১২) বিশ শতকের শেষভাগে সক্রিয় একজন প্রথিতযশা বাঙালি সাহিত্যিক। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, সম্পাদক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। জীবনানন্দ-পরবর্তী আধুনিক বাংলা কবিতায় অন্যতম প্রধান কবি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় "নীললোহিত", "সনাতন পাঠক", "নীল উপাধ্যায়" ইত্যাদি ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here
    Captcha verification failed!
    CAPTCHA user score failed. Please contact us!

    ভাঙার গান

      ১   কারার ওই লৌহ-কবাট ভেঙে ফেল কর রে লোপাট   রক্তজমাট   শিকল-পুজোর পাষাণবেদি! ওরে ও তরুণ ঈশান! বাজা তোর প্রলয়-বিষাণ!   ধ্বংসনিশান   উড়ুক প্রাচী-র প্রাচীর ভেদি।   ২   গাজনের বাজনা বাজা কে মালিক? কে সে রাজা?   কে দেয় সাজা   মুক্ত স্বাধীন সত্যকে রে? হা হা হা পায় যে...

    নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে

    নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে, হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে হৃদয়ে রয়েছ গোপনে। বাসনা বসে মন অবিরত, ধায় দশ দিশে পাগলের মতো। স্থির আঁখি তুমি ক্ষরণে শতত জাগিছ...

    স্বাধীনতা তুমি

    স্বাধীনতা তুমি রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান। স্বাধীনতা তুমি কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা- স্বাধীনতা তুমি শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা স্বাধীনতা তুমি পতাকা-শোভিত...

    খোলামকুচি

    সকাল থেকেই ভার হয়ে আছে মেঘ। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের সাপ বিষ ঢেলে দেয় আকাশে। বৃষ্টির তবু দেখা নেই, শুধু তর্জন-গর্জন। বাবুয়া চা-দোকান থেকে বেরিয়ে...

    পাদটীকা

    গত শতকের শেষ আর এই শতকের গোড়ার দিকে আমাদের দেশের টোলগুলো মড়ক লেগে প্রায় সম্পূর্ণ উজাড় হয়ে যায়। পাঠান-মোগল আমলে যে দুর্দৈব ঘটেনি ইংরাজ...

    সাতঘরিয়া

    মনপত্থল গাঁয়ের সামনের দিকে সরকারী পাকা সড়ক; এখানে যাকে বলে পাক্কী। পেছনে দক্ষিণ কোয়েলের মরা খাত। কোয়েল এখন নামেই নদী। এই জেঠ মাহিনা অর্থাৎ...

    রস

    কার্তিকের মাঝামাঝি চৌধুরীদের খেজুর বাগান ঝুরতে শুরু করল মোতালেফ। তারপর দিন পনের যেতে না যেতেই নিকা করে নিয়ে এল পাশের বাড়ির রাজেক মৃধার বিধবা...

    লেখক অমনিবাস

    এই বিভাগে