সপ্তাহের সেরা

    আখ্যাত রচনা

    আরবি ভাষার কি আঞ্চলিক রূপ আছে? — প্রথম পর্ব

    পৃথিবীর প্রতিটি কথ্য ভাষার আঞ্চলিক রূপ রয়েছে। আমাদের বাংলা ভাষা প্রধানত বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভাষা। এছাড়া ত্রিপুরা, আসাম, ঝাড়খণ্ড ও বার্মার আরাকানেও প্রচলিত আছে। এটুকু ভূখণ্ডেই বাংলা ভাষার অনেকগুলো আঞ্চলিক রূপ আছে।

    আঞ্চলিক ভাষা কি প্রমিত ভাষার বিকৃত রূপ?

    না। এভাবে বলা যায় না। বলা হয় প্রতি ৭ কিমি পরপর মানুষের মুখের ভাষা কিছুটা পরিবর্তিত হয়, যাকে বলা হয় ডায়ালেক্ট। আঞ্চলিক ভাষা বিকৃত তো নয়ই, বরং এটিই ন্যাচারাল বা প্রকৃতিজাত ভাষা। আঞ্চলিক ভাষাগুলো সেই সেই ভাষার সৌন্দর্যের আধার। প্রতিটি ভাষা যেমন মূল্যবান, সেই ভাষার আঞ্চলিক রূপগুলোও মূল্যবান।

    সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মুখে মুখে আঞ্চলিক ভাষার পরিবর্তন ঘটে। দুশো বছর আগে বাংলা ভাষার যে রূপে মানুষ কথা বলত এখন তা অনেকটাই পরিবর্তিত। এবং এটিই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আঞ্চলিক ভাষায়ও পঞ্চাশ/একশো বছর আগে মুরুব্বিরা যে শব্দগুলো ব্যবহার করতেন তার অনেকগুলোই এখন নতুন প্রজন্মের মুখে অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

    পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার মতো আরবি ভাষারও আঞ্চলিক রূপ আছে।

    আরব ভূখণ্ডে প্রায় ২৩টি আরব দেশ রয়েছে। তাছাড়া আরও প্রায় ৪-৫টি দেশ রয়েছে যেখানে ৫-১০% লোক আরবি ভাষায় কথা বলে। সে হিসেবে ন্যূনতম ৩০টি দেশের ভাষা আরবি ভাষার কাছাকাছি।

    যাই হোক আরবি একক কোনও ভাষা নয় বরং কতগুলি ডায়ালেক্টের সমষ্টি।

    কওমী মাদ্রাসায় যে আরবি পড়ানো হয় তা হলো কুরআনের আরবি। যাকে MSA (Modern standard Arabic) বলে। এ হল ক্লাসিকাল আরবি যা ২৩টি আরবদেশের যে ডায়ালেক্টগুলি প্রচলিত রয়েছে সেগুলির মধ্যে যে শব্দগুলি কমন বা সাধারণ রয়েছে তা নিয়ে বানানো একটি কৃত্রিম ভাষা।

    আর MSA-তে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় কুরআনের শব্দগুলি। কেননা ২৩টি আরব দেশই মুসলিম দেশ হওয়ায় সবাই কুরআনের শব্দগুলি বুঝবে।

    এখন রিয়েলিটি হল এই গ্রহের একজন লোকও সরাসরি MSA-তে কথা বলে না। এটা কৃত্রিম ও বানানো ভাষা। কুরআনের আরবি উচ্চাঙ্গের সাহিত্যিক ভাষা। আরবি ভাষার শব্দভাণ্ডার বিশাল। এক ঘোড়ারই রয়েছে একশোর উপরে প্রতিশব্দ। আরবি ভাষায় সবেমাত্র জন্ম নেওয়া ঘোড়ার বাচ্চাকে বলে ‘মুহর’। দুধ খাওয়া বন্ধ করেছে এমন বাচ্চাকে বলে ‘ফুলউ’। এক বছর বয়স হলে বলে ‘হাওলি’। দুই বছর হলে বলে ‘জাযআ’। তিন বছর বয়স হলে ‘সিনয়া’। চারবছর বয়স হলে বলে ‘রবাআ’। পাঁচ বছর বয়স হলে বলে ‘ক্বদিহা’। এভাবে ঘোড়ার বয়সের পরিক্রমায় তার নামের ধরন পাল্টাতে থাকে।

    যেসব ঘোড়া দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় সেগুলোরও বিভিন্ন রকমের নাম আছে। যেমন–

    সাবিক বা মুবাররিয : সর্বাগ্রে পৌঁছে যাওয়া ঘোড়া।

    মুসল্লা : দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী ঘোড়া।

    মুআফফা : তৃতীয় স্থান অর্জনকারী ঘোড়া।

    এভাবে ধারাবাহিকভাবে তালি, মুরতাহ, আতিফ, বারিউ, মুআম্মিল, লাতিম, সুকাইম ইত্যাদি। সুকাইম বলা হয় যে ঘোড়াটা সর্বশেষ এসে পৌঁছেছে।

    ঘোড়ার গায়ের রংয়ের ভিন্নতায়ও তার আলাদা আলাদা নাম আছে। এমন আরবি অন্য শব্দের বেলায়ও বলা যায়। শব্দভাণ্ডারের দিক দিয়ে এবং যেকোনো সাহিত্যিক ব্যাখ্যায় আরবি পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ ভাষা।

    কুরআনের যে মাতৃভাষা তা হুবহু কথ্য ডায়ালেক্টে বর্তমানে চালু নেই।

    সৌদিরা নজদি ডায়ালেক্ট ও কিছু সংখ্যক সৌদি লেবানিজ ডায়ালেক্টে কথা বলে। সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সহজ ডায়ালেক্ট মিশরীয় ডায়ালেক্ট।

    egyptian dialectic /মিশরীয় উপভাষা

    Lebanese dialect / লেবাননের উপভাষা।

    এ দুটি ভাষার পার্থক্য হিন্দি ও উর্দুর পার্থক্য থেকেও কম।

    তার চেয়ে মজার ব্যপার হলো এ দুটি ডায়ালেক্ট ভালো করে শিখলে ইরাক থেকে শুরু করে মরক্কোর ভাষা ৮০% যে কেউ বুঝতে সক্ষম হবেন।

    তারচেয়ে মজার ব্যাপার হলো আরবির খুব কাছাকাছি ভাষা হলো হিব্রু। শব্দের মিল না থাকলেও প্যাটার্নের মিল থাকায় একে আফ্রো-এশিয়াটিক ভাষা বলে।

    আরবি ভাষার উদ্ভব হয়েছিল আরব উপদ্বীপে, যে এলাকায় এখন সৌদি আরব, খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতাব্দীতে। এটি সেমেটিক ভাষা পরিবারের সদস্য, যার মধ্যে হিব্রু, আরামাইক এবং আক্কাদিয়ানও রয়েছে।

    আরবি ভাষা একটি সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যময় ভাষা এবং এটি বিশ্বব্যাপী ৪০০ মিলিয়নেরও বেশি লোকের দ্বারা বলা হয়। এটি ২৬টি দেশের সরকারি ভাষা এবং এটি বাণিজ্য ও কূটনীতির একটি প্রধান ভাষা।

    আরবি ভাষা সেমিটীয় গোত্রের ভাষাসমূহের অন্তর্গত একটি ভাষা। অন্যান্য জীবিত সেমিটীয় ভাষাগুলির মধ্যে রয়েছে আধুনিক হিব্রু ভাষা (ইসরাইলের ভাষা), আমহারীয় (ইথিওপিয়ার ভাষা), এবং ইথিওপিয়ায় প্রচলিত অন্যান্য ভাষা। মৃত সেমিটীয় ভাষাগুলির মধ্যে আছে ধর্মগ্রন্থ তোরাহ-র প্রাচীন হিব্রু ভাষা, আক্কদীয় ভাষা (ব্যাবিলনীয় ও আসিরীয়), সিরিয় ভাষা ও ইথিওপীয় ভাষা।

    পরবর্তী পর্বে থাকবে পবিত্র কোরান কেন আরবি ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছিল।

    (ক্রমশঃ)

    তথ্যপুঞ্জি :

    ১) আরব দেশের ভাষা

    ২) আহমেদ শরীফ

    ৩) মোহাম্মদ নুর হাবীব

    ৪) ব্যাকরণ ও বিবিধ

    মোরশেদ হাসান
    মোরশেদ হাসান
    ব্যক্তিজীবনে একজন চিকিৎসক তিনি। বাংলা ব্যাকরণেও রয়েছে প্রচুর আগ্রহ। ব্যাকরণও শব্দ বিষয়ে প্রকাশিত হয়ে বই। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আরও অনেকে রচনা।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here
    Captcha verification failed!
    CAPTCHA user score failed. Please contact us!
    <