সপ্তাহের সেরা

    আখ্যাত রচনা

    অনুবাদআরব্য রজনীর চতুর্থ রজনী

    আরব্য রজনীর চতুর্থ রজনী

    আরব্য রজনীর চতুর্থ রজনী

    চতুর্থ রজনী, দুনিয়াজাদ শাহরাজাদকে তার গল্পটি শেষ করতে অনুরোধ জানাল, যদি সে ঘুমিয়ে না পড়ে। তখন সে বলতে শুরু করল—

    আমি শুনেছি, হে মহান রাজা, যখন ধীবর ইফ্রিতকে বলেছিল স্বচক্ষে না দেখলে তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করবেন না, তখন ইফ্রিতের মধ্যে প্রকম্পন শুরু হয়ে গেল, সে সাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা শীতল ধোঁয়ার মেঘের মত হয়ে গেল। অতঃপর সে ধোঁয়া সংকুচিত হয়ে এল এবং ধীরে ধীরে সে ঘড়ার ভিতর প্রবেশ করতে লাগল। ধোঁয়ার মেঘ সম্পূর্ণরূপে ঘড়ার ভিতর প্রবেশ করার পর ধীবর দ্রুত ইসমে আযম খোদাই করা সীসার ঢাকনাটি হাতে তুলে নিল এবং ঘড়ার মুখে লাগিয়ে দিল। তিনি ইফ্রিতকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘আমাকে বল, তুমি কিভাবে মরতে চাও? আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে সাগরে ফেলে দিব এবং এখানে আমার জন্য একটি বাড়ি তৈরি করব, যাতে কেউ এখানে মাছ শিকারের জন্য এলে আমি তাদের বলতে পারি যে এখানে একজন বেইমান ইফ্রিত আছে যে তাকে উদ্ধার করে সে তাকে হত্যা করতে চায়।’

    ইফ্রিত এই কথা শুনে নিজেকে ঘড়ার ভিতর বন্দী দেখতে পেল। সে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করল এবং রাজা সুলাইমানের সীলমোহর থাকায় বেরুতে ব্যর্থ হল। সে ধীবরের চালাকি বুঝতে পারল।

    ‘আমি তো মশকারা করেছি,’ ইফ্রিতের এই কথা শুনে ধীবর বললেন, ‘তুমি মিথ্যা বলেছ, তুমি অতীব নীচাশয়, জঘন্য ও ইফ্রিতদের মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণ্য।’ অতঃপর তিনি ঘড়াটি তুলে নিলেন।

    সে বারংবার বলতে লাগল, ‘আমাকে মেরো না, আমাকে মেরো না।’

    ধীবর তার জবাবে বলতে লাগলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাকে মরে ফেলব, অবশ্যই মারব।’ ইফ্রিত কোমল ও বিনীতস্বরে জানতে চাইল তিনি তার সাথে কী করতে চান।

    ‘আমি তোমাকে সাগরে নিক্ষেপ করব,’ বললেন ধীবর, ‘তুমি হয়ত আঠার শত বছর ধরে সেখানে ছিলে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তোমাকে সেখানেই থাকতে হবে। আমি কি তোমাকে বলিনি, “আমাকে ছেড়ে দাও, আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। আমাকে হত্যা করো না, নয়ত আল্লাহ তোমাকে এমন একজনের অধীন করে দিবে যে তোমাকে হত্যা করবে?” কিন্তু তুমি প্রত্যাখান করেছ এবং আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ। এখন আল্লাহ তোমাকে আমার অধীন করে দিয়েছেন, এখন আমিও তোমার সাথে তোমার মতই আচরণ করব।’

    ‘ঘড়াটা খোল,’ ইফ্রিত অনুনয় করে উঠল, ‘আমি তোমার অনেক ভাল করব।’

    ‘অভিশপ্ত মিথ্যাবাদী,’ ধীবর বললেন, ‘তুমি আর আমি রাজা য়ুনানের মন্ত্রী ও হাকিম দুবানের মত।’

    ‘তাদের মধ্যে কী হয়েছিল?’ জানতে চাইল ইফ্রিত। ধীবর বলতে শুরু করলেন—

    রাজা য়ুনানের মন্ত্রীর গল্প

    ইফ্রিত, তুমি নিশ্চয় জানো যে, প্রাচীনকালের কোন এক সময়ে ফারস দেশের রুমান প্রদেশে য়ুনান নামক এক রাজা ছিলেন। তিনি ছিলেন সম্পদশালী ও মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি যার সৈন্যবাহিনী ও সমস্ত প্রকারের প্রহরী ছিল। তবে তিনি কুষ্ঠরোগীও ছিলেন, বিভিন্ন ধরণের ওষুধ খেতেন ও মলম ব্যবহার করতেন, কিন্তু তার অসুস্থতা বৈদ্য ও জ্ঞানী লোকেরা নিরাময় করতে পারেননি।

    একজন বৃদ্ধ বৈদ্য ছিলেন, লোকেরা তাকে হাকিম দুবান বলে ডাকত। তিনি গ্রীক, পারসি, আরবী ও সিরিয়ীয় অনেক গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করেছিলেন। তিনি ওষুধ ও জ্যোতির্বিদ্যায় পণ্ডিত ছিলেন, এই বিষয়ের মৌলিক নীতিগুলো ছিল তার নখদর্পণে, কোনটি উপকারী, কোনটি ক্ষতিকর এই বিষয়ে তার ছিল বিস্তর জ্ঞান। ভেষজ ও লতাপাতার কোনগুলো ক্ষতিকারক ও কোনগুলো সহায়ক তিনি তা জানতেন। ওষুধ ও অন্যান্য বিজ্ঞানের পাশাপাশি দর্শন শাস্ত্রেও ছিল তার পরম পাণ্ডিত্য।

    যখন তিনি শহরে এসেছিলেন, কয়েকদিনের মধ্যেই শুনলেন যে রাজা কুষ্ঠরোগে ভুগছেন। কোন বৈদ্য অথবা কোন জ্ঞানী মানুষই তার নিরাময় করতে সক্ষম হননি। তিনি এই সমস্যার কথা চিন্তা করে সমস্ত রাত কাটালেন। প্রত্যুষে তিনি তার সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরিধান করে রাজার সাক্ষাতে গেলেন। তিনি তার হস্ত চুম্বন করলেন এবং তার গৌরব ও সৌভাগ্যের অব্যাহত থাকার জন্য প্রার্থনা করলেন। নিজের পরিচয় দেওয়ার পর তিনি বললেন, ‘মহামান্য রাজা, আমি আপনার রোগের কথা শুনেছি, যেটি আপনাকে অনেক পীড়িত করেছে এবং আপনি অনেক চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসাও করিয়েছেন কিন্তু তারা তা দুর করতে সক্ষম হননি। আমি আপনাকে সেবন করার কোন ওষুধ বা মাখার কোন মলম না দিয়েই আপনাকে সুস্থ করে দিব।’

    য়ুনান তার কথা শুনে বিস্মিত হয়ে গেলেন, জিজ্ঞাসা করলেন যে তিনি কিভাবে এই কাজ করবেন। তিনি তাকে ও তার সন্তান-সন্তুতিদের সমৃদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। ‘আমি আপনার প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করব,’ রাজা বললেন, ‘আপনাকে আমার মঙ্গলকামী সহচর ও প্রিয় বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে আপনার সকল ইচ্ছাপূর্ণ করব।’

    তারপর রাজা হাকিম দুবানকে সম্মানজনক পোশাক উপহার দিলেন ও তার সাথে সদয় আচরণ করলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কি সত্যিই ওষুধ বা মলম ছাড়াই আমার কুষ্ঠরোগ নিরাময় করতে যাচ্ছেন?’

    দুবান পুনরায় বললেন যে তিনি তাই করবেন। বিস্ময়াবিষ্ট রাজা জানতে চাইলেন কখন এটি হবে, তাকে দ্রুত করার অনুরোধ জানালেন।

    ‘যথাজ্ঞা,’ বলে জবাব দিলেন দুবান, প্রতিজ্ঞা করলেন পরবর্তী সপ্তাহের মধ্যেই তিনি কাজটি করবেন।

    দুবান রাজার কাছ থেকে চলে গেলেন, গ্রন্থাদি, ভেষজ ও জড়িবটি রাখার জন্য তিনি একটি ঘর ভাড়া করেছিলেন, তিনি সেখানে ফিরে এলেন। তিনি একমুখ বন্ধ একটি ফাঁপা লাঠি তৈরি করলেন, তার ভিতরে কিছু ভেষজ রাখলেন এবং একটা হাতল বানিয়ে অন্যমুখে সে হালত লাগালেন। তিনি দক্ষতার সহিত একটি গোলক তৈরি করলেন। সম্পূর্ণ তৈরি হওয়ার পরের দিন তিনি রাজার দরবারে উপস্থিত হলেন, অবনত মস্তকে তার হস্তচুম্বন করলেন, তাকে মাঠে গিয়ে পলো খেলতে বললেন। রাজা, ওমরাহ, সভাসদ, মন্ত্রী ও রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের নিয়ে মাঠে গেলেন। খেলা শুরু করার আগে দুবান তার কাছে এসে পলোর লাঠিটি ধরিয়ে দিলেন। বললেন, ‘এটি নিন।’

    ‘এটাকে এভাবে ধরুন, যখন সওয়ার হয়ে মাঠে নামবেন, তখন হাত ঘুরিয়ে জোরে বলটিতে আঘাত করুন, যতক্ষণ না আপনার হাত ও সমস্ত দেহ ঘর্মাক্ত হয়ে যায় ততক্ষণ খেলতে থাকুন। আপনার হাতের তালুর মধ্য দিয়ে ওষুধ আপনার সারা দেহে ছড়িয়ে পড়বে। আপনার খেলা শেষ হবে, ওষুধও দেহে ছড়িয়ে পড়বে, তখন প্রাসাদে ফিরে গিয়ে ভাল করে স্নান করুন এবং ঘুমিয়ে পড়ুন। আপনার সুস্থতার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।’

    তখন রাজা তার হাত থেকে লাঠিটি নিলেন, ঘোড়ায় চড়লেন এবং শক্ত করে লাঠিটি ধরলেন। তিনি গোলকটি সম্মুখে ছুড়ে মারলেন, পিছু ছুটে সমস্ত শক্তি দিয়ে সেটিতে আঘাত করলেন। আবার ঘোড়ায় চড়ে গোলকের কাছে পৌঁছলেন এবং সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করলেন। এভাবে ভেষজ লাঠিটি খপ্পরে রেখে আঘাত করতে থাকলেন যতক্ষণ না তার হাত ও সমস্ত শরীর ঘেমে নেয়ে যায়। দুবান দেখলেন, ওষুধ রাজার শরীরে প্রবেশ করেছে, তিনি তাকে প্রাসাদে ফিরে গিয়ে গোসল করতে বললেন। রাজা সোজা প্রাসাদে ফিরে গেলেন এবং তার জন্য স্নানাগার প্রস্তুত করতে নির্দেশ দিলেন। স্নানাগার প্রস্তুত হলে পরিচারক ও দাসেরা দ্রুত তার কাছে গেল এবং তার পরিধানের জন্য পোশাক প্রস্তুত করে দিল। তিনি স্নানাগারে প্রবেশ করলেন এবং ভালভাবে স্নান করে পোশাক পরিধান করে বেরিয়ে এলেন। অতঃপর প্রাসাদে ফিরে এলেন এবং ঘুমে তলিয়ে গেলেন।

    তার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট ছিল। হাকিম দুবান রাত কাটানোর জন্য তার বাসায় ফিরে গেলেন। প্রভাতে এসে তিনি রাজার সাথে দেখা করার অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তাকে অনুমতি প্রদান করা হল। তিনি প্রবেশ করে রাজার হস্তবুচি করলেন। এবং তাকে সম্বোধন করে বললেন—

    মর্যাদা বৃদ্ধি পায় যখন আপনাকে বাবা ডাকা হয়,

    এই খেতাব যার তার জন্য গ্রহণীয় নয়।

    আপনার মুখের উজ্জ্বলতা দূর করে দেয়

    প্রতিটি কবরকে আবৃত করা অন্ধকার।

    মুখের উজ্জ্বলতা কখনও শেষ হবে না,

    যদিও সময় কখনও ভ্রুকুটি হানে।

    আপনার মহানুভবতা আমাকে পুরষ্কৃত করেছে

    যা মেঘের ধারাকে পাহাড়ে নামিয়ে এনেছে।

    আপনার দাক্ষিণ্য আপনার সম্পদ ক্ষয় করে

    যতক্ষণ না আপনি আকাঙ্ক্ষার শিখরে না চড়েন।

    দুবান যখন লাইনগুলো শেষ করলেন, তখন রাজা উঠে দাঁড়ালেন এবং তাকে আলিঙ্গন করলেন। অতঃপর তাকে সম্মানজনক জমকালো আলখাল্লা উপহার দিলেন এবং তাকে তার পাশে বসালেন।

    এর কারণ ছিল, যখন তিনি স্নানাগার থেকে বের হয়েছিলেন তখন তিনি তার দেহের দিকে তাকিয়েছিলেন এবং দেখে তিনি প্রশান্তি অনুভব করেছিলেন, তিনি নিরাময় লাভ করেছেন, তার পরিচ্ছন্ন ও রূপালী ত্বকে কুষ্ঠরোগের চিহ্নমাত্র নেই। সকালে তিনি দরবারে গেলেন, তার রাজসিংহাসনে আসন গ্রহন করলেন, তার পারিষদবর্গ ও রাজকর্মচারীগণ তার সম্মুখে দাঁড়িয়েছিলেন, ঠিক তখনই দুবান এসেছিলেন। রাজা তাকে সম্মান জানিয়ে দ্রুত দাঁড়ালেন, হাকিম তার পাশে বসলেন। জমকালো দস্তরখান সাজানো হল। তিনি রাজার সাথে আহার করলেন এবং বাকিদিন তাকে সঙ্গ দিলেন। রাজা তাকে সম্মানজনক আলখাল্লা এবং অন্যান্য উপহার ছাড়াও দুই হাজার দিনার উপহার দিলেন। তিনি তাকে নিজের ঘোড়াও সওয়ার করলেন।

    দুবান তার বাড়িতে ফিরে এলেন, রাজা তাকে তার কর্মের জন্য ভূয়সী প্রশংসা করে বিদায় জানালেন। তিনি বললেন, ‘এই লোকটি কোন বাহ্যিক মলম ব্যবহার না করেই আমাকে নিরাময় করেছেন। আল্লাহর কসম, এটা একটা উচ্চমানের দক্ষতা! তিনি উপহার ও অনুগ্রহ লাভের যোগ্য এবং আমি সর্বদা তার সাথে একজন বন্ধু ও সহচরের মত আচরণ করব।’

    রাজা তার শারীরিক সুস্থতা ও রোগ থেকে মুক্তি পেয়ে আনন্দিত হয়ে একটি আনন্দঘন রাত্রি যাপন করলেন। পরের দিন তিনি দরবারে এলেন এবং তার রাজসিংহাসনে আরোহন করলেন। যখন তার রাজকর্মচারীরা দাঁড়িয়েছিলেন এবং ওমরাহ ও মন্ত্রীগণ তার ডানে ও বামে বসেছিলেন। তখন তিনি দুবানকে তলব করলেন, তিনি প্রবেশ করে রাজার হস্তচুম্বন করলেন, তখন রাজা উঠে দাঁড়িয়ে তাকে অভ্যার্থনা জানালেন, তাকে তার পাশে বসালেন এবং একসাথে পানাহার করলেন। অতঃপর তাকে আরও সম্মানজনক পোশাক উপহার হিসেবে দিলেন এবং রাত্রি না হওয়া পর্যন্ত তার সাথে খোশগল্প করলেন। অতঃপর তাকে তিনি আরও পাঁচটি সম্মানজনক পোশাক ও একহাজার দিনার দিলেন, তারপর দুবান কৃতজ্ঞতার সাথে বাড়ি ফিরে এলেন।

    পরবর্তী সকালে রাজা তার দরবারে এলেন, সেখানে তিনি আমিরগণ, মন্ত্রীগণ ও পারিষদ পরিবেষ্টিত ছিলেন। মন্ত্রীদের মধ্যে একজন জঘন্য ও কুৎসিত, নীচ, কুঞ্জুস এবং ঈর্ষাকাতর ছিলেন যেন তিনি ঈর্ষার প্রেমে পড়েছেন। এই ব্যক্তি যখন দেখলেন যে, রাজা দুবানকে অন্তরঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং তাকে অনুগ্রহ দিয়ে পুরষ্কৃত করছেন, তিনি ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠলেন এবং তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পরিকল্পনা করলেন। কথিত আছে, ‘কেউই ঈর্ষা মুক্ত নয়,’ এবং ‘বর্বরতা আত্মার মধ্যে লুকিয়ে থাকে; শক্তি তাকে প্রদর্শন করে ও দুর্বলতা তাকে গোপন রাখে।’

    মন্ত্রী রাজা য়ুনানের কাছে এলেন, তার হস্তচুম্বন করলেন এবং বললেন, ‘যুগের রাজা, আমি আপনার অনুগ্রহে পরিবেষ্টিত হয়ে বড় হয়েছি, আমি আপনাকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতে চাই। আমি যদি আপনার কাছে এটা লুকিয়ে রাখি, আমি নিজেকে একজন অকৃতজ্ঞ মনে করব, কিন্তু আপনি যদি এটি আপনাকে দিতে বলেন, তবে আমি তাই করব।’

    এতে রাজা য়ুনান বিরক্ত হলেন, বললেন, ‘আপনার পরামর্শ কী?’

    ‘হে মহান রাজা,’ মন্ত্রী জবাব দিলেন, ‘একটি প্রাচীন প্রবচন আছে যে, সময় তাদের বন্ধু নয়, যারা তাদের কর্মফল বিবেচনা করে না। আমি লক্ষ্য করেছি যে, মহামান্য, আপনি অযাচিতভাবে একজন শত্রুর প্রতি মহানুভবতা দেখাচ্ছেন, যে আপনার রাজ্য ধ্বংস করে দিতে চায়। আপনি এই লোকটির সাথে উদার আচরণ করছেন এবং তাকে সবচেয়ে বড় সম্মান দিয়েছেন, তাকে অন্তরঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যা আমাকে শঙ্কিত করে তুলছে।’

    য়ুনান অস্থির হয়ে উঠলেন, তার রঙ বদলে গেল, তিনি মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন তিনি তার সম্পর্কে বললছেন।

    ‘আপনি যদি ঘুমিয়ে থাকেন, জেগে উঠুন,’ মন্ত্রী তাকে বললেন, ‘আমি হাকিম দুবানের কথা বলছি।’

    ‘মুখ সামলে কথা বল,’ চিৎকার করে উঠলেন য়ুনান, ‘ইনি আমার বন্ধু, আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, কেননা, তিনিই আমাকে সুস্থ করে তুলেছেন। আমি এমন একটি রোগ হাতে ধরেছিলাম যা অন্য কোন চিকিৎসক নিরাময় করতে পারেন নি। এই যুগে, এই পৃথিবীতে পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত তার মত আর কাউকে পাবেন না। আপনি তাকে অভিযুক্ত করতে পারেন, কিন্তু আমি তাকে এক হাজার দিনার মাসিক আয়সহ বেতন ও ভাতা প্রদান করতে যাচ্ছি, যদিও আমি তার সাথে আমার রাজ্য ভাগ করে নিলেও কম হবে। আমি মনে করি, ঈর্ষাই তোমাকে এমন কথা বলাচ্ছে যা আমাকে রাজা সিন্দবাদের কাহিনী মনে করিয়ে দিচ্ছে।’

    শাহরাজাদ যখন বুঝতে পারলেন যে ভোর হয়েছে, তিনি তার গল্পবলা বন্ধ করে দিলেন।

    তাহের আলমাহদী
    তাহের আলমাহদী
    জন্ম কুমিল্লায়। পড়াশোনা করেছেন লাকসাম নওয়াব ফয়েজুন্নেসা সরকারি কলেজ ও নোয়াখালী সরকারি কলেজে। রিযিকের সন্ধানে দেড় যুগের বেশি সময় আছেন সাউদী আরবে। সাহিত্যের চর্চা ছাত্রজীবন থেকে হলেও কোন লেখাই প্রকাশিত হয়নি। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগের বশেই গড়ে তুলেছে সাহিত্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠান এডুলিচার। এছাড়া বিনামূল্য গ্রন্থ সরবরাহের জন্য আছে এডুলিচার অনলাইন লাইব্রেরি এবং সম্পাদনা করছেন অনলাইন সাহিত্য পত্র ‘জেগে আছি’।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here
    Captcha verification failed!
    CAPTCHA user score failed. Please contact us!

    আরব্য রজনীর তৃতীয় রজনী

    তৃতীয় রজনীতে দুনিয়াজাদ তার বোনকে গল্পটি শেষ করতে বলল। ‘সানন্দে,’ বলে শুরু করল শাহরাজাদ: ‘হে সৌভাগ্যবান রাজা, আমি শুনেছি যে তৃতীয় বৃদ্ধ ইফ্রিতকে অন্য...

    আরব্য রজনীর দ্বিতীয় রজনী

    যখন দ্বিতীয় রাত হল, দুনিয়াজাদ শাহরাজাদকে বললেন, ‘আপু, আমাদের জন্য তোমার বণিক ও ইফ্রিতের গল্প শেষ কর।’ ‘সানন্দে,’ জবাব দিল শাহরাজাদ, ‘যদি রাজা অনুমতি প্রদান...

    আরব্য রজনীর প্রথম রজনী

    বণিক ও ইফরিতের গল্প শাহরাজাদ বলেছিলেন: আমি শুনেছি, হে সুখী রাজা, এক ছিলেন ধনী বণিক, দেশজুড়ে ছিল তার বিভিন্ন ব্যবসায়, একদিন তিনি অশ্বারোহণে কোন একটি...

    আরব্য রজনী : গাধা, বলদ ও বণিকের গল্প

    গাধা, বলদ ও বণিকের গল্প যখন তার পিতা এই কথা শুনলেন, তিনি তাকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার এবং রাজার মধ্যে যা ঘটেছিল তার সবই...

    আরব্য রজনী : রাজা শাহরিয়ার ও তার ভাইয়ের গল্প

    রাজা শাহরিয়ার ও তার ভাইয়ের গল্প প্রাচীন মানুষদের ইতিহাসে একটি কাহিনী প্রচলিত আছে যে, প্রাচীনকালে ভারত ও চৈনিক দ্বীপপুঞ্জে সাসানীয় সাম্রাজ্যের একজন রাজা ছিলেন। তার...

    লেখক অমনিবাস

    আরব্য রজনীর প্রথম রজনী

    বণিক ও ইফরিতের গল্প শাহরাজাদ বলেছিলেন: আমি শুনেছি, হে সুখী রাজা, এক ছিলেন ধনী বণিক, দেশজুড়ে ছিল তার বিভিন্ন ব্যবসায়, একদিন তিনি অশ্বারোহণে কোন একটি...

    হিজড়াদের সামাজিক পুনর্বাসন সম্ভব কি?

    রাজা-বাদশাহদের যুগে কিছু মানুষের পুরুষত্ব নষ্ট করে নপুংশক বানান হত, মোঘল প্রাসাদ, ভারতবর্ষে নবাবদের প্রাসাদ এবং ইরানে এই ধরনের লোকেদের বলা হত খোজা, ওসমানীয়...

    পরিবর্তন

    হৃদয় ছিল আমাজানের মত, সহস্রাধ