সপ্তাহের সেরা

    আখ্যাত রচনা

    রস

    কার্তিকের মাঝামাঝি চৌধুরীদের খেজুর বাগান ঝুরতে শুরু করল মোতালেফ। তারপর দিন পনের যেতে না যেতেই নিকা করে নিয়ে এল পাশের বাড়ির রাজেক মৃধার বিধবা স্ত্রী মাজু খাতুনকে। পাড়া-পড়শি সবাই তো অবাক। এই অবশ্য প্রথম সংসার নয় মোতালেফের। এর আগের বউ বছরখানেক আগে মারা গেছে। তবু পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের জোয়ান পুরুষ মোতালেফ। আর মাজু খাতুন ত্রিশে না পৌঁছালেও তার কাছাকাছি গেছে। ছেলেপুলের ঝামেলা অবশ্য মাজু খাতুনের নেই। মেয়ে ছিল একটি, কাঠিখালীর শেখদের ঘরে বিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ঝামেলা যেমন নেই, তেমনি মাজু খাতুনের আছেই বা কী। বাঙ্-সিন্দুক ভরে যেন কত সোনাদানা রেখে গেছে রাজেক মৃধা, মাঠভরে যেন কত ক্ষেত-ক্ষামার রেখে গেছে যে তার ওয়ারিশি পাবে মাজু খাতুন। ভাগের ভাগ ভিটার পেয়েছে কাঠাখানেক, আর আছে একখানি পড়ো পড়ো শণের কুঁড়ে। এই তো বিষয়-সম্পত্তি, তারপর দেখতেই বা এমনকি একখানা ডানাকাটা হুরীর মত চেহারা। দজ্জাল মেয়েমানুষের আঁটসাঁট শক্ত গড়নটুকু ছাড়া কী আছে মাজু খাতুনের যা দেখে ভোলে পুরুষেরা, মন তাদের মুগ্ধ হয়।

    সিকদারবাড়ি, কাজীবাড়ির বউ-ঝিরা হাসাহাসি করল, ‘তুক করছে মাগী, ধুলা-পড়া দিছে চৌখে।’

    মুন্সীদের ছোট বউ সাকিনা বলল, ‘দিছে ভাল করছে। দেবে না? অমন মানুষের চৌখে ধুলা-পড়া দেওয়নেরই কাম। খোদা তো পাতা দেয় নাই চৌখে। দেখছো তো কেমন ট্যারাইয়া ট্যারাইয়া চায়। ধুলা ছিটাইয়া থাকে তো বেশ করছে।’

    কথাটা মিথ্যা নয়, চাউনিটা একটু তেরছা তেরছা মোতালেফের। বেছে বেছে সুন্দর মুখের দিকে তাকায়। সুন্দর মুখের খোঁজ করে ঘোরে তার চোখ। অল্প বয়সী খুবসুরত চেহারার একটি বউ আনবে ঘরে, এত দিন ধরে সেই চেষ্টাই সে করে এসেছে। কিন্তু দরে পটেনি কারও সঙ্গে। যারই ঘরে একটু ডাগর গোছের সুন্দর মেয়ে আছে সেই হেঁকে বসেছে পাঁচ কুড়ি-সাত কুড়ি। মোতালেফের সবচেয়ে পছন্দ হয়েছিল ফুলবানুকে।

    চরকান্দার এলেম সেখের মেয়ে ফুলবানু। আঠার-উনিশ বছর হবে বয়স। রসে টলটল করছে সর্বাঙ্গ, টগবগ করছে মন। ইতিমধ্যে অবশ্য এক হাত ঘুরে এসেছে ফুলবানু। খেতে-পরতে কষ্ট দেয়, মারধর করে—এই সব অজুহাতে তালাক নিয়ে এসেছে কইডুবির গফুর সিকদারের কাছ থেকে। আসলে বয়স বেশি আর চেহারা সুন্দর নয় বলে গফুরকে পছন্দ হয়নি ফুলবানুর। সেই জন্যই ইচ্ছা করে নিজে ঝগড়া-কোন্দল বাধিয়েছে তার সঙ্গে। কিন্তু এক হাত ঘুরে এসেছে বলে কিছু ক্ষয়ে যায়নি ফুলবানুর, বরং চেকনাই আর জেল্লা খুলেছে দেহের, রসের ঢেউ খেলে যাচ্ছে মনের মধ্যে। চরকান্দায় নদীর ঘাটে ফুলবানুকে একদিন দেখেছিল মোতালেফ। একনজরেই বুঝেছিল যে সেও নজরে পড়েছে। চেহারাখানা তো বেমানান নয় মোতালেফের। নীল লুঙ্গি পরলে ফরসা ছিপছিপে চেহারায় চমৎকার খোলতাই হয় তার, তা ছাড়া এমন ঢেউ-খেলানো টেরিকাটা বাবরিই বা এ তল্লাটে কজনের মাথায় আছে। ফুলবানুর সুনজরের কথা বুঝতে বাকি ছিল না মোতালেফের। খুঁজে খুঁজে গিয়েছিল সে এলেম সেখের বাড়িতে। কিন্তু এলেম তাকে আমল দেয়নি। বলেছে, গতবার যথেষ্ট শিক্ষা হয়ে গেছে তার। এবার আর না দেখে-শুনে যার-তার হাতে মেয়ে দেবে না। আসলে টাকা চায় এলেম। গাঁটের কড়ি যা খরচ করতে হয়েছে মেয়েকে তালাক নেওয়াতে গিয়ে, সুদে-আসলে তা পুরিয়ে নিতে চায়। গুনাগার চায় সেই লোকসানের। আঁচ নিয়ে দেখেছে মোতালেফ সে গুনাগার দু-এক কুড়ি নয়, পাঁচ কুড়ি একেবারে। তার কমে কিছুতেই রাজি হবে না এলেম। কিন্তু অত টাকা সে দেবে কোত্থেকে।

    মুখ ভার করে চলে আসছিল মোতালেফ। আশ্‌শেওড়া আর চোখ-উদানের আগাছার জঙ্গলা ভিটার মধ্যে ফের দেখা হল ফুলবানুর সঙ্গে। কলসি কাঁকে জল নিতে চলেছে ঘাটে। মোতালেফ বুঝল সময় বুঝেই দরকার পড়েছে তার জলের।

    এদিক-ওদিক তাকিয়ে ফিক করে একটু হাসল ফুলবানু, ‘কী মেঞা, গোসা কইরা ফিরা চল্‌লা নাকি?’

    ‘চলব না? শোনলা নি টাকার খাককাই তোমার বাজানের!’

    ফুলবানু বলল, ‘হ, হ, শুনছি। চাইছে তো দোষ হইছে কি? পছন্দসই জিনিস নেবা বাজানের গুনা, তার দাম দেবা না?’

    মোতালেফ বলল, ‘ও খাককাইটা আসলে বাজানের নয়, বাজানের মাইয়ার। হাটে-বাজারে গেলেই পার ধামায় উইঠা।’

    মোতালেফের রাগ দেখে হাসল ফুলবানু, ‘কেবল ধামায় ক্যান, পালায় উইঠা বসব। মুঠ ভইরা ভইরা সোনা-জহরত ওজন কইরা দেবা পালায়। বোঝব ক্ষেমতা, বোঝব কেমন পুরুষ মাইনষের মুঠ।’ মোতালেফ হনহন করে চলে যাচ্ছিল। ফুলবানু ফের ডাকল পিছন থেকে, ‘ও সোন্দর মিঞা, রাগ করলানি? শোন শোন।’

    মোতালেফ ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘কী শুনব?’

    এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে আরও একটু এগিয়ে এল ফুলবানু, ‘শোনবা আবার কী, শোনবা মনের কথা। শোন, বাজানের মাইয়া টাকা চায় না, সোনা-দানাও চায় না, কেবল মান রাখতে চায় মনের মাইনষের। মাইনষের ত্যাগ দেখতে চায়, বুঝছ?’

    মোতালেফ ঘাড় নেড়ে জানাল, বুঝেছে।

    ফুলবানু বলল, ‘তাই বইলা আকাম-কুকাম কইরো না মেঞা, জমি ক্ষেত বেচতে যাইও না।’

    বেচবার মত জমি ক্ষেত অবশ্য মোতালেফের নেই, কিন্তু সে গুমর ফুলবানুর কাছে ভাঙল না মোতালেফ, বলল, ‘আইচ্ছা, শীতের কয়ডা মাস যাউক, ত্যাগও দেখাব, মানও দেখাব। কিন্তু বিবিজানের সবুর থাকবেনি দেখবার?’

    ফুলবানু হেসে বলল, ‘খুব থাকব। তেমন বেসবুর বিবি ভাইবো না আমারে।’

    গায়ে এসে আর একবার ধারের চেষ্টা করে দেখল মোতালেফ। গেল মল্লিকবাড়ি, মুখজ্যেবাড়ি, সিকদারবাড়ি, মুন্সীবাড়ি—কিন্তু কোথাও সুরাহা হয়ে উঠল না টাকার। নিলে তো আর সহজে হাত উপুড় করবার অভ্যেস নেই মোতালেফের। ধারের টাকা তার কাছ থেকে আদায় করে নিতে বেজায় ঝামেলা। সাধ করে কে পোয়াতে যাবে সেই ঝক্কি।

    কিন্তু নগদ টাকা ধার না পেলেও শীতের সূচনাতেই পাড়ার চার-পাঁচ কুড়ি খেজুর গাছের বন্দোবস্ত পেল মোতালেফ। গত বছর থেকেই গাছের সংখ্যা বাড়ছিল, এবার চৌধুরীদের বাগানের দেড় কুড়ি গাছ বেশি হল। গাছ কেটে হাঁড়ি পেতে রস নামিয়ে দিতে হবে। অর্ধেক রস মালিকের, অর্ধেক তার। মেহনত কম নয়, এক একটি করে এতগুলো গাছের শুকনো মরা ডালগুলো বেছে বেছে আগে কেটে ফেলতে হবে। বালিকাচায় ধার তুলে তুলে জুতসই করে নিতে হবে ছ্যান। তারপর সেই ধারালো ছ্যানে গাছের আগা চেঁছে চেঁছে তার মধ্যে নল পুঁততে হবে সরু কঞ্চি ফেড়ে। সেই নলের মুখে লাগসই করে বাঁধতে হবে মেটে হাঁড়ি। তবে তো রাতভরে টুপ টুপ করে রস পড়বে সেই হাঁড়িতে। অনেক খাটুনি, অনেক খেজমত। শুকনো শক্ত খেজুর গাছ থেকে রস বের করতে হলে আগে ঘাম বের করতে হয় গায়ের। এ তো আর মায়ের দুধ নয়, গাইয়ের দুধ নয় যে বোঁটায়-বানে মুখ দিলেই হল।

    অবশ্য কেবল খাটতে জানলেই হয় না, গাছে উঠতে-নামতে জানলেই হয় না, গুণ থাকা চাই হাতের। যে ধারালো ছ্যান একটু চামড়ায় লাগলেই ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে মানুষের গা থেকে, হাতের গুণে সেই ছ্যানের ছোঁয়ায় খেজুর গাছের ভেতর থেকে মিষ্টি রস চুইয়ে পড়ে। এ তো আর ধান কাটা নয়, পাট কাটা নয় যে কাঁচির পোঁচে গাছের গোড়াসুদ্ধ কেটে নিলেই হল। এর নাম খেজুর গাছ কাটা। কাটতেও হবে, আবার হাত বুলোতেও হবে। খেয়াল রাখতে হবে গাছ যেন ব্যথা না পায়, যেন কোন ক্ষতি না হয় গাছের। একটু এদিক-ওদিক হলে বছর ঘুরতে না ঘুরতে গাছের দফারফা হয়ে যাবে, মরা মুখ দেখতে হবে গাছের। সে গাছের গুঁড়িতে ঘাটের পৈঠা হবে, ঘরের পৈঠা হবে, কিন্তু ফোঁটায় ফোঁটায় সে গাছ থেকে হাঁড়ির মধ্যে রস ঝরবে না রাতভরে।

    খেজুর গাছ থেকে রস নামাবার বিদ্যা মোতালেফকে নিজ হাতে শিখিয়েছিল রাজেক মৃধা। রস সম্বন্ধে এসব তত্ত্বকথা আর বিধিনিষেধও তার মুখের। রাজেকের মত অমন নামডাকওয়ালা ‘গাছি’ ধারে-কাছে ছিল না। যে গাছের প্রায় বার আনা ডালই শুকিয়ে এসেছে, সে গাছ থেকেও রস বেরুত রাজেকের হাতের ছোঁয়ায়। অন্য কেউ গাছ কাটলে যে গাছ থেকে রস পড়ত আধ-হাঁড়ি, রাজেকের হাতে পড়লে সে রস গলা-হাঁড়িতে উঠত। তার হাতে খেজুর গাছ ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকত গৃহস্থরা। গাছের কোন ক্ষতি হত না, রসও পড়ত হাঁড়ি ভরে। বছর কয়েক ধরে রাজেকের শাগরেদ হয়েছিল মোতালেফ, পিছনে পিছনে ঘুরত, কাজ করত সঙ্গে সঙ্গে। শাগরেদ দু-চারজন আরও ছিল রাজেকের—সিকদারদের মকবুল, কাজীদের ইসমাইল। কিন্তু মোতালেফের মত হাত পাকেনি কারও। রাজেকের স্থান আর কেউ নিতে পারেনি তার মত।

    কিন্তু কেবল গাছ কাটলেই তো হবে না কুড়িতে কুড়িতে, রসের হাঁড়ি বয়ে আনলেই তো হবে না বাঁশের বাখারির ভারায় ঝুলিয়ে, রস জ্বাল দিয়ে গুড় করবার মত মানুষ চাই। পুরুষ মানুষ গাছ থেকে কেবল রসই পেড়ে আনতে পারে, কিন্তু উনান কেটে, জ্বালানি জোগাড় করে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বসে বসে সেই তরল রস জ্বাল দিয়ে তাকে ঘন পাটালি গুড়ে পরিণত করবার ভার মেয়েমানুষের ওপর। শুধু কাঁচা রস দিয়ে তো লাভ নেই, রস থেকে গুড় আর গুড় থেকে পয়সায় কাঁচা রস যখন পাকা রূপ নেবে তখন সিদ্ধি, কেবল তখনই সার্থক হবে সকল খেজমত, মেহনত। কিন্তু বছর দুই ধরে বাড়িতে সেই মানুষ নেই মোতালেফের। ছেলেবেলায় মা মরেছিল। দুই বছর আগে বউ মরে ঘর একেবারে খালি করে দিয়ে গেছে।

    সন্ধ্যার পর মোতালেফ এসে দাঁড়াল মাজু খাতুনের ঝাঁপ-আঁটা ঘরের সামনে, ‘জাগনো আছ নাকি মাজু বিবি?’

    ঘরের ভেতর থেকে মাজু খাতুন সাড়া দিয়ে বলল, ‘কেডা?’

    ‘আমি মোতালেফ। শুইয়া পড়ছি বুঝি? কষ্ট কইরা উইঠা যদি ঝাঁপটা একবার খুইলা দিতা, কয়ডা কথা কইতাম তোমার সাথে।’

    মাজু খাতুন উঠে ঝাঁপ খুলে দিয়ে বলল, ‘কথা যে কী কবা তা তো জানি। রসের কাল আইছে আর মনে পইড়া গেছে মাজু খাতুনরে। রস জ্বাল দিয়া দিতে হবে। কিন্তু সেরে চাইর আনা কইরা পয়সা দেবা মেঞা। তার কমে পারব না। গতরে সুখ নাই এ বছর।’

    মোতালেফ মিষ্টি করে বলল, ‘গতরের আর দোষ কী বিবি। গতর তো মনের হাত ধইরা ধইরা চলে। মনের সুখই গতরের সুখ।’

    মাজু খাতুন বলল, ‘তা যাই কও তাই কও মেঞা, চাইর আনার কমে পারব না এবার।’

    মোতালেফ এবার মধুর ভঙ্গিতে হাসল, ‘চাইর আনা ক্যান বিবি, যদি ষোল আনা দিতে চাই, রাজি হবা তো নিতে?’

    মোতালেফের হাসির ভঙ্গিতে মাজু খাতুনের বুকের মধ্যে একটু যেন কেমন করে উঠল, কিন্তু মুখে বলল, ‘তোমার রঙ্গ তামাশা থুইয়া দাও মেঞা। কাজের কথা কবা তো কও, নইলে যাই, শুই গিয়া।’

    মোতালেফ বলল, ‘শোবাই তো। রাইত তো শুইয়া ঘুমাবার জন্যেই। কিন্তু শুইলেই কি আর চোখে ঘুম আসে মাজু বিবি, না চাইয়া চাইয়া এই শীতের লম্বা রাইত কাটান যায়?’

    ইশারা-ইঙ্গিত রেখে এরপর মোতালেফ আরও স্পষ্ট করে খুলে বলল মনের কথা। কোন রকম অন্যায় সুবিধা-সুযোগ নিতে চায় না সে। মোল্লা ডেকে কলমা পড়ে সে নিকা করে নিয়ে যেতে চায় মাজু খাতুনকে। ঘর-গেরস্তালির ষোল আনা ভার তুলে দিতে চায় তার হাতে।

    প্রস্তাব শুনে মাজু খাতুন প্রথমে অবাক হয়ে গেল, তারপর একটু ধমকের সুরে বলল, ‘রঙ্গ তামাশার আর মানুষ পাইলা না তুমি! ক্যান, কাঁচা বয়সের মাইয়াপোলার কি অভাব হইছে নাকি দেশে যে তাগো থুইয়া তুমি আসবা আমার দুয়ারে!’

    মোতালেফ বলল, ‘অভাব হবে ক্যান মাজু বিবি। কম বয়সী মাইয়াপোলা অনেক পাওয়া যায়। কিন্তু শত হইলেও তারা কাঁচা রসের হাঁড়ি।’

    কথার ভঙ্গিতে একটু কৌতুক বোধ করল মাজু খাতুন, বলল, ‘সাঁচাই নাকি! আর আমি?’

    ‘তোমার কথা আলাদা। তুমি হইলা নেশার কালে তাড়ি আর নাশতার কালে গুড়, তোমার সাথে তাগো তুলনা?’

    তখনকার মত মোতালেফকে বিদায় দিলেও তার কথাগুলো মাজু খাতুনের মন থেকে সহজে বিদায় নিতে চাইল না। অন্ধকার নিঃসঙ্গ শয্যায় মোতালেফের কথাগুলো মনের ভেতরটায় কেবলই তোলপাড় করতে লাগল। মোতালেফের সঙ্গে পরিচয় অল্প দিনের নয়। রাজেক যখন বেঁচে ছিল, তার সঙ্গে সঙ্গে থেকে যখন কাজকর্ম করত মোতালেফ, তখন থেকেই এ বাড়িতে তার আনাগোনা, তখন থেকেই জানাশোনা দুজনের। কিন্তু সেই জানাশোনার মধ্যে কোন গভীরতা ছিল না। মাঝে মাঝে একটু হালকা ঠাট্টা-তামাশা চলত, কিন্তু তার বেশি এগুবার কথা মনেই পড়েনি কারও। মোতালেফের ঘরে ছিল বউ, মাজু খাতুনের ঘরে ছিল স্বামী। স্বভাবটা একটু কঠিন আর কাঠখোট্টা ধরনেরই ছিল রাজেকের। ভারি কড়া-কড়া চাঁছাছোলা ছিল তার কথাবার্তা। শীতের সময় কুড়িতে কুড়িতে রসের হাঁড়ি আনত মাজু খাতুনের উঠানে আর মাজু খাতুন সেই রস জ্বাল দিয়ে করত পাটালি গুড়। হাতের গুণ ছিল মাজু খাতুনের। তার তৈরি গুড়ের সের দুই পয়সা বেশি দরে বিক্রি হত বাজারে। রাজেক মরে যাওয়ার পর পাড়ার বেশির ভাগ খেজুর গাছই গেছে মোতালেফের হাতে। দু-এক হাঁড়ি রস কোনবার ভদ্রতা করে তাকে খেতে দেয় মোতালেফ, কিন্তু আগেকার মত হাঁড়িতে আর ভরে যায় না তার উঠান। গতবার মাসখানেক তাকে রস জ্বাল দিতে দিয়েছিল মোতালেফ। চুক্তি ছিল দুই আনা করে পয়সা দেবে প্রতি সেরে, কিন্তু মাসখানেক পরেই সন্দেহ হয়েছিল মোতালেফের মাজু খাতুন গুড় চুরি করে রাখছে, অন্য কাউকে দিয়ে গোপনে গোপনে বিক্রি করাচ্ছে সেই গুড়, ষোল আনা জিনিস পাচ্ছে না মোতালেফ। ফলে কথান্তর মনান্তর হয়ে সে বন্দোবস্ত ভেস্তে গিয়েছিল। কিন্তু এবার তার ঘরে রসের হাঁড়ি পাঠাবার প্রস্তাব নিয়ে আসেনি মোতালেফ, মাজু খাতুনকেই নিজের ঘরে নিয়ে যেতে চেয়েছে। এমন প্রস্তাব পাড়ার আধ-বুড়োদের দলের আরও করেছে দু-একজন কিন্তু মাজু খাতুন কান দেয়নি তাদের কথায়। ছেলে ছোকরাদের মধ্যে যারা একটু বেশি বাড়াবাড়ি রকমের ইয়ার্কি দিতে এসেছে, তাদের কান কেটে নেওয়ার ভয় দেখিয়েছে মাজু খাতুন। কিন্তু মোতালেফের প্রস্তাব সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। তাকে যেন তেমনভাবে তাড়ান যায় না। তাকে তাড়ালেও তার কথাগুলো ফিরে ফিরে আসতে থাকে মনের মধ্যে। পাড়ায় এমন চমৎকার কথা বলতে পারে না আর কেউ, অমন খুবসুরত মুখ কারও নেই, অমন মানানসই কথাও নেই কারও মুখে।

    মোতালেফকে আরও আসতে হল দু-এক সন্ধ্যা, তারপর নীল রঙের জোলাকী শাড়ি পরে, রং-বেরঙের কাঁচের চুড়ি হাতে দিয়ে মোতালেফের পিছনে পিছনে তার ঘরের মধ্যে এসে ঢুকল মাজু খাতুন।

    ঘরদোরের কোন শ্রী-ছাঁদ নেই, ভারি অপরিষ্কার আর অগোছাল হয়ে রয়েছে সব। কোমরে আঁচল জড়িয়ে মাজু খাতুন লেগে গেল ঘরকন্নার কাজে। ঝাঁট দিয়ে দিয়ে জঞ্জাল দূর করল উঠানের, লেপেপুঁছে ঝকঝকে, তকতকে করে তুলল ঘরের মেঝে।

    কিন্তু ঘর আর ঘরনির দিকে তাকাবার সময় নেই মোতালেফের, সে আছে গাছে গাছে। পাড়ায় আরও অনেকের—বোসেদের, বাঁডুজ্যেদের গাছের বন্দোবস্ত নিয়েছে মোতালেফ। গাছ কাটছে, হাঁড়ি পাতছে, হাঁড়ি নামাচ্ছে, ভাগ করে দিচ্ছে রস। পাঁকাটির একখানা চালা তুলে দিয়েছে মাজু খাতুনকে মোতালেফ উঠানের পশ্চিম দিকে। সারে সারে উনান কেটে তার ওপর বড় বড় মাটির জ্বালা বসিয়ে সেই চালাঘরের মধ্যে বসে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রস জ্বাল দেয় মাজু খাতুন। জ্বালানির জন্যে মাঠ থেকে খড়ের নাড়া নিয়ে আসে মোতালেফ, জোগাড় করে আনে খেজুরের শুকনো ডাল। কিন্তু তাতে কি কুলোয়? মাজু খাতুন এর-ওর বাগান থেকে জঙ্গল থেকে শুকনো পাতা ঝাঁট দিয়ে আনে ঝাঁকা ভরে ভরে, পলো ভরে ভরে, বিকেলে বসে বসে দা দিয়ে টুকর টুকর করে শুকনো ডাল কাটে জ্বালানির জন্যে। বিরাম নেই বিশ্রাম নেই, খাটুনি গায়ে লাগে না, অনেক দিন পরে মনের মত কাজ পেয়েছে মাজু খাতুন, মনের মত মানুষ পেয়েছে ঘরে।

    ধামা ভরে ভরে হাটে-বাজারে গুড় নিয়ে যায় মোতালেফ, বিক্রি করে আসে চড়া দামে! বাজারের মধ্যে সেরা গুড় তার। পড়ন্ত বেলায় ফের যায় গাছে গাছে হাঁড়ি পাততে। তল্লাবাঁশের একেকটি করে চোঙা ঝুলতে থাকে গাছে। সকালে রসের হাঁড়ি নামিয়ে ঝরার চোঙা বেঁধে দিয়ে যায় মোতালেফ। সারা দিনের ময়লা রস চোঙাগুলোর মধ্যে জমা থাকে। চোঙা বদলে গাছ চেঁছে হাঁড়ি পাতে বিকেলে এসে। চোঙার ময়লা রস ফেলা যায় না। জ্বাল দিয়ে চিটে গুড় হয় তাতে তামাক মাখবার। বাজারে তাও বিক্রি হয় পাঁচ আনা ছয় আনা সের। দুবেলা দুবার করে এতগুলো গাছে উঠতে-নামতে ঘনঘন নিঃশ্বাস পড়ে মোতালেফের, পৌষের শীতেও সর্বাঙ্গ দিয়ে ঘাম ঝরে চুইয়ে চুইয়ে। সকালবেলায় রোমশ বুকের মধ্যে ঘামের ফোঁটা চিকচিক করে। পায়ের নিচে দূর্বার মধ্যে চিকচিক করে রাত্রির জমা শিশির। মোতালেফের দিকে তাকিয়ে পাড়া-পড়শিরা অবাক হয়ে যায়। চিরকালই অবশ্য খাটিয়ে মানুষ মোতালেফ, কিন্তু বেশি উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে, দিনরাত এমন কলের মত পরিশ্রম করতে এর আগে তাকে দেখা যায়নি কোন দিন। ব্যাপারটা কী? গাছ কাটা অবশ্য মনের মত কাজই মোতালেফের, কিন্তু পছন্দসই মনের মানুষ কি সত্যিই এল ঘরে?

    সেরা গাছের সবচেয়ে মিষ্টি দুই হাঁড়ি রস আর সের তিনেক পাটালি গুড় নিয়ে মোতালেফ গিয়ে একদিন উপস্থিত হল চরকান্দায় এলেম সেখের বাড়িতে। সেলাম জানিয়ে এলেমের পায়ের সামনে নামিয়ে রাখল রসের হাঁড়ি, গুড়ের সাজি, তারপর কোঁচার খুঁটের বাঁধন খুলে বের করল পাঁচখানা দশ টাকার নোট, বলল, ‘অর্ধেক আগাম দিলাম মেঞাসাব।’

    এলেম বলল, ‘আগাম কিসের?’

    মোতালেফ বলল, ‘আপনার মাইয়ার—’

    তাজা করকরে নোট বেছে নিয়ে এসেছে মোতালেফ। কোনায়, কিনারে চুল পরিমাণ ছিঁড়ে যায়নি কোথাও, কোন জায়গায় ছাপ লাগেনি ময়লা হাতের। নগদ পঞ্চাশ টাকা। নোটগুলোর ওপর হাত বুলোতে বুলোতে এলেম বলল, ‘কিন্তু এখন আর টাকা আগাম নিয়া আমি কী করব মেঞা? তুমি তো শোনলাম নেকা কইরা নিছ রাজেক মেরধার কবিলারে। সতীনের ঘরে যাবে ক্যান আমার মাইয়া। মাইয়া কি ঝগড়া আর চিল্লাচিল্লি করবে, মারামারি-কাটাকাটি কইরা মরবে দিনরাইত।’

    মোতালেফ মুচকে হাসল। বলল, ‘তার জৈন্যে ভাবেন ক্যান মেঞাসাব। গাছে রস যদ্দিন আছে, গায়ে শীত যদ্দিন আছে, মাজু খাতুনও তদ্দিন আছে আমার ঘরে। দক্ষিণা বাতাস খেললেই সব সাফ হইয়া যাবে উইড়া।’

    এলেম সেখ জলচৌকি এগিয়ে দিল মোতালেফকে বসতে, হাতের হুঁকোটা এগিয়ে ধরল মোতালেফের দিকে, তারিফ করে বলল, ‘মগজের মধ্যে তোমার সাঁচাই জিনিস আছে মিঞা, সুখ আছে তোমার সাথে কথা কইয়া, কাম কইরা।’

    ফুলবানুকেও একবার চোখের দেখা দেখে যেতে অনুমতি পেল মোতালেফ। আড়াল থেকে দেখতে-শুনতে ফুলবানুর কিছু বাকি ছিল না। তবু মোতালেফকে দেখে ঠোঁট ফুলালো ফুলবানু, ‘বেসবুর কেডা হইল মেঞা? এদিকে আমি রইলাম পথ চাইয়া তুমি ঘরে নিয়া ঢুকাইলা আর একজনারে।’

    মোতালেফ জবাব দিল, ‘না ঢুকায়ে করি কী!’

    মানের দায়ে জানের দায়ে বাধ্য হয়ে তাকে এই ফন্দি খুঁজতে হয়েছে। ঘরে কেউ না থাকলে পানি-চুনি দেয় কে, প্রাণ বাঁচে কী করে। ঘরে কেউ না থাকলে রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করে কে। আর সেই গুড় বিক্রি করে টাকা না আনলেই বা মান বাঁচে কী করে।

    ফুলবানু বলল, ‘বোঝলাম, মানও বাঁচাইলা, জানও বাঁচাইলা, কিন্তু গায়ে যে আরেকজনের গন্ধ জড়াই রইল, তা ছাড়াবা কেমনে।’

    মনে এলেও মুখ ফুটে এ কথাটা বলল না মোতালেফ যে মানুষ চলে গেলে তার গন্ধ সত্যিই আরেকজনের গায়ে জড়িয়ে থাকে না, তা যদি থাকত তাহলে সে গন্ধ তো ফুলবানুর গা থেকেও বেরুতে পারত। কিন্তু সে কথা চেপে গিয়ে মোতালেফ ঘুরিয়ে জবাব দিল, বলল, ‘গন্ধের জন্য ভাবনা কি ফুল বিবি। সোডা-সাবান কিনা দেব বাজার গুনা। ঘাটের পৈঠায় পা ঝুলাইয়া বসব তোমারে লইয়া। গতর গুনা ঘইসা ঘইসা বদ গন্ধ উঠাইয়া ফেইলো।’

    মুখে আঁচল চাপতে চাপতে ফুলবানু বলল, ‘সাঁচাই নাকি?’

    মোতালেফ বলল, ‘সাঁচা না ত কি মিছা? শুইঙ্গা দেইখো তখন নতুন মাইনষের নতুন গন্ধে ভুরভুর করবে গতর। দক্ষিণা বাতাসে চুলের গন্ধে ফুলের গন্ধে ভুরভুর করবে, কেবল সবুর কইরা থাক আর দুইখান মাস।’

    ফুলবানু আর একবার ভরসা দিয়ে বলল, ‘বেসবুর মানুষ ভাইবো না আমারে।’

    যে কথা সেই কাজ মোতালেফের, দুই মাসের বেশি সবুর করতে হল না ফুলবানুকে। গুড় বেচে আরও পঞ্চাশ টাকা জোগাড় হইতে মোতালেফ মাজু খাতুনকে তালাক দিল। কারণটাও সঙ্গে সঙ্গে পাড়া-পড়শিকে সাড়ম্বরে জানিয়ে দিল। মাজু বিবির স্বভাব-চরিত্র খারাপ। রাজেকের দাদা ওয়াহেদ মৃধার সঙ্গে তার আচার-ব্যবহার ভারি আপত্তিকর।

    মাজু খাতুন জিভ কেটে বলল, ‘আউ আউ ছি ছি! তোমার গতরই কেবল সোন্দর মোতিমেঞা, ভিতর সোন্দর না। এত শয়তানি, এত ছলচাতুরী তোমার মনে? গুড়ের সময় পিঁপড়ার মত লাইগা ছিলা, আর গুড় যাই ফুরাইল অমনি দূর দূর!’

    কিন্তু অত কথা শোনবার সময় নেই মোতালেফের; ধৈর্যও নেই।

    আমের গাছ বোলে ভরে উঠল, গাবগাছের ডালে ডালে গজাল তামাটে রঙের কচি কচি নতুন পাতা। শীতের পরে এল বসন্ত, মাজু খাতুনের পরে এল ফুলবানু। ফুলের মতই মুখ। ফুলের গন্ধ তার নিঃশ্বাসে। পাড়া-পড়শি বলল, ‘এবার মানাইছে, এবার সাঁচাই বাহার খোলছে ঘরের!’

    ফুর্তির অন্ত নেই মোতালেফের মনে। দিনভর কিষান কামলা খাটে। তারপর সন্ধ্যা হতে না হতেই এসে আঁচল ধরে ফুলবানুর, ‘থুইয়া দাও তোমার রান্ধন-বাড়ন ঘরগেরস্তালি। কাছে বস আইসা।’

    ফুলবানু হাসে, ‘সবুর সবুর! এ কয় মাস কাটাইলা কী কইরা মেঞা?’

    মোতালেফ জবাব দেয়, ‘খেজুর গাছ লইয়া।’

    নিবিড় বাহুবেষ্টনের মধ্যে দম প্রায় বন্ধ হয়ে আসে ফুলবানুর, একটু নিঃশ্বাস নিয়ে হেসে বলে, ‘তুমি আবার সেই গাছের কাছেই ফিরা যাও। গাছির আদর গাছেই সইতে পারে।’

    মোতালেফ বলে, ‘কিন্তু গাছির কাছেও যে গাছের রস দুই-চাইর মাসেই ফুরায় ফুলজান, কেবল তোমার রসই বছরে বার মাস চোয়াইয়া চোয়াইয়া পড়ে।’

    মাজু খাতুন ফের গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল রাজেকের পড়ো পড়ো শণের কুঁড়েয়। ভেবেছিল আগের মতই দিন কাটবে। কিন্তু দিন যদিবা কাটে, রাত কাটে না। মোতালেফ তার সর্বনাশ করে ছেড়েছে। পাড়া-পড়শিরা এসে সাড়ম্বরে সালঙ্কারে মোতালেফ আর ফুলবানুর ঘরকন্নার বর্ণনা করে, একটু বা সকৌতুক তিরস্কারের সুরে বলে, ‘নাঃ বউ বউ কইরা পাগল হইয়া গেল মানুষটা। যেখানেই যায় বউ ছাড়া আর কথা নাই মুখে।’

    বুকের ভেতরটা জ্বলে ওঠে মাজু খাতুনের। মনে হয় সেও বুঝি হিংসায় পাগল হয়ে যাবে। বুক ফেটে মরে যাবে সে।

    দিন কয়েক পরে রাজেকের বড় ভাই ওয়াহেদই নিয়ে এল সম্বন্ধ। বউটার দশা দেখে ভারি মায়া হয়েছে তার। নদীর ওপারে তালকান্দায় নাদির শেখের সঙ্গে দোস্তি আছে ওয়াহেদের। এক মাল্লাই নৌকা বায় নাদির। মাসখানেক আগে কলেরায় তার বউ মারা গেছে। অপোগণ্ড ছেলেমেয়ে রেখে গেছে অনেকগুলো। তাদের নিয়ে ভারি মুশকিলে পড়েছে বেচারা। কম বয়সী ছুঁড়ি-টুড়িতে দরকার নেই তার। সে হয়ত পটের বিবি সেজে থাকবে, ছেলেমেয়ের যত্ন-আত্তি করবে না। তাই মাজু খাতুনের মত একটু ভারিক্কি ধীরবুদ্ধি গৃহস্থঘরের বউই তার পছন্দ। তার ওপর নির্ভর করতে পারবে সে।

    মাজু খাতুন জিজ্ঞেস করল, ‘বয়স কত হবে তার?’

    ওয়াহেদ জবাব দিল, ‘তা আমাগো বয়সীই হবে। পঞ্চাশ, এক-পঞ্চাশ।’

    মাজু খাতুন খুশি হয়ে ঘাড় নেড়ে জানাল—হ্যাঁ, ঐ রকমই তার চাই। কম বয়সে তার আস্থা নেই। বিশ্বাস নেই যৌবনকে।

    তারপর মাজু খাতুন জিজ্ঞেস করল, ‘গাছি না তো সে? খাজুর গাছ কাটতে যায় না তো শীতকালে?’

    ওয়াহেদ বিস্মিত হয়ে বলল, ‘গাছ কাটতে যাবে ক্যান! ওসব কাম কোন কালে জানে না সে। বর্ষাকালে নৌকা বায়, শীতকালে কিষান কামলা খাটে, ঘরামির কাজ করে। ক্যান বউ, গাছি ছাড়া, রসের ব্যাপারী ছাড়া কি তুমি নিকা বসবা না কারও সাথে?’

    মাজু খাতুন ঠিক উল্টো জবাব দিল। রসের সঙ্গে কিছুমাত্র যার সম্পর্ক নেই, শীতকালের খেজুর গাছের ধারে কাছেও যে যায় না, নিকা যদি বসে মাজু খাতুন তার সঙ্গেই বসবে। রসের ব্যাপারে মাজু খাতুনের ঘেন্না ধরে গেছে।

    ওয়াহেদ বলল, ‘তাহলে কথাবার্তা কই নাদিরের সাথে? সে বেশি দেরি করতে চায় না।’ মাজু খাতুন বলল, ‘দেরি কইরা কাম কী।’

    দেরি বেশি হলও না, সপ্তাহখানেকের মধ্যে কথাবার্তা সব ঠিক হয়ে গেল। নাদিরের সঙ্গে এক মাল্লাই নৌকায় গিয়ে উঠল মাজু খাতুন। পার হয়ে গেল নদী।

    মোতালেফ স্ত্রীকে বলল, ‘আপদ গেল। পেত্নীর মত ফাঁৎ ফাঁৎ নিঃশ্বাস ফেলত, চোখের ওপর শাপমন্যি করত দিনরাইত, তার হাতগুনা তো বাঁচলাম, কী কও ফুলজান?’

    ফুলবানু হেসে বলল, ‘পেত্নীরে খুব ডরাও বুঝি মেঞা?’

    মোতালেফ বলল, ‘না, এখন আর ডরাই না। পেত্নী তো ছুইটাই গেল। এখন চোখ মেললেই তো পরী। এখন ডরাই পরীরে।’

    ‘ক্যান, পরীরে আবার ডর কিসের তোমার?’

    ‘ডর নাই? পাখা মেইলা কখন উড়াল দেয় তার ঠিক কী!’

    ফুলবানু বলল, ‘না মেঞা, পরীর আর উড়াল দেওয়ার সাধ নাই। সে তার পছন্দসই সব পাইয়া গেছে। এখন ঘরের মাইনষের পছন্দ আর নজরডা বরাবর এই রকম থাকলে হয়।’

    মোতালেফ বলল, ‘চৌখ যদ্দিন আছে, নজরও তদ্দিন থাকবে।’

    দিনরাত ভারি আদরে-তোয়াজে রাখল মোতালেফ বউকে। কোন মাছ খেতে ভালবাসে ফুলবানু হাটে যাওয়ার আগে শুনে যায়, ট্যাঁকে পয়সা না থাকলে কারও কাছ থেকে পয়সা ধার করে কেনে সেই মাছ। ডিমটা, আনাজটা, তরকারিটা যখন যা পারে হাট-বাজার থেকে নিয়ে আসে মোতালেফ। ফি হাটে আনে পান সুপারি খয়ের মসলা।

    ফুলবানু বলে, ‘অত পান আন ক্যান, তুমি তো বেশি ভক্ত না পানের। দিনরাইত খালি ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ তামাক টান।’ মোতালেফ বলল, ‘পান আনি তোমার জৈন্যে। দিন ভইরা পান খাবা, খাইয়া খাইয়া ঠোঁট রাঙ্গাবা।’

    ফুলবানু ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, ‘ক্যান, আমার ঠোঁট এমনে বুঝি রাঙ্গা না যে পান খাইয়া রাঙ্গাইতে হবে? আমি পান সাইজা দেই, তুমিই বরং দিনরাইত খাওয়া ধর। তামাক খাইয়া খাইয়া কালা হইয়া গেছে ঠোঁট, পানের রসে রাঙ্গাইয়া নেও।’

    মোতালেফ হেসে বলল, ‘পুরুষ মাইনষের ঠোঁট তো ফুলজান কেবল পানের রসে রাঙ্গা হয় না, আর-একজনের পানখাওয়া-ঠোঁটের রস লাগে।’

    নিজের ভুঁই ক্ষেত নেই মোতালেফের। মল্লিকদের, মুখুজ্যেদের কিছু কিছু জমি বর্গা চষে। কিন্তু ভাল কিষান বলে তেমন খ্যাতি নেই, জমির পরিমাণ, ফসলের পরিমাণ অন্য সকলের মত নয়। সিকদারদের, মুন্সীদের জমিতে কিষান খাটে। পাট নিড়ায়, পাট কাটে, পাট জাগ দেয়, ধোয়, মেলে। ভারি খেজমত খাটুনি খাটে। ফরসা রং রোদে পুড়ে কাল হয়ে যায় মোতালেফের। বর্গা জমির পাট খুব বেশি ওঠে না উঠানে। সিকদাররা, মুন্সীরা নগদ টাকা দেয়। কেবল মল্লিক আর মুখুজ্যেদের বিঘেচারেক ভুঁইয়ের ভাগের ভাগ অর্ধেক জাগ-দেওয়া পাট নৌকা ভরে খালের ঘাটে এনে নামায় মোতালেফ। পাট ছাড়াতে ভারি উৎসাহ ফুলবানুর। কিন্তু মোতালেফ সহজে তাকে পাটে হাত দিতে দেয় না, বলে, ‘কষ্ট হবে, পচা গন্ধ হবে গায়।’

    ফুলবানু বলে, ‘হইল তো বইয়া গেল, রউদে পুইড়া তুমি কালা কালা হইয়া গেলা, আর আমি পাট নিতে পারব না, কষ্ট হবে। কেমন