সপ্তাহের সেরা

    আখ্যাত রচনা

    সাতঘরিয়া

    মনপত্থল গাঁয়ের সামনের দিকে সরকারী পাকা সড়ক; এখানে যাকে বলে পাক্কী। পেছনে দক্ষিণ কোয়েলের মরা খাত। কোয়েল এখন নামেই নদী। এই জেঠ মাহিনা অর্থাৎ জষ্ঠি মাসে বাদামী বালির পাহাড়ের তলায় যে জলটুকু রয়েছে তাতে হাঁটুও ডোবে না।

    মনপত্থল জল-অচল অচ্ছুৎদের গাঁ। এর উত্তর দিকে থাকে ধাঙড়েরা, দক্ষিণে গঞ্জুরা, পশ্চিমে দোসাদরা।

    ভোরবেলা দোসাদটোলার চাঁপিয়া কোয়েলের হাঁটুভর পানিতে নাহানা (স্নান) সেরে নিজের ধসে-পড়া কোমর-বাঁকা ঘরটার দাওয়ায় বসে আছে। আর থেকে থেকেই থুতনি তুলে চনমন করে দূরে পাক্কীর দিকে তাকাচ্ছে। ঐ সড়কটা ধরে পুব দিক থেকে নাটোয়ারের আসার কথা।

    এত ভোরে গঞ্জুটোলা ধাঙড়টোলা বা দোসাদটোলায় কারও ঘুম ভাঙেনি। তবে ধাঙড়পাড়ার পাল পাল শুয়োর এর মধ্যেই খাদ্যের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে। জানোয়ারগুলোর পেটে সারাক্ষণ রাহুর খিদে। শুয়োর ছাড়া আর যারা জেগেছে তারা হল পাখি। ঝাঁক ঝাঁক পরদেশী শুগা আর চোটা পাখি ডানায় বাতাস চিরে চিরে পাক্কীর ওধারে ধু-ধু মাঠের দিকে উড়ে যাচ্ছে।

    মনপত্থলের যে ধারেই তাকানো যাক, পরাস সিমার গাছের ছড়াছড়ি। তিন মাস আগে সেই যে গাছগুলো থোকায় থোকায় লাল ডগডগে ফুল ফোটাতে শুরু করেছিল, এখনও ফুটিয়েই যাচ্ছে। আর আছে সফেদিয়া গোলগোলি এবং মনরঙ্গোলি গাছের অজস্র ঝোপ। প্রতিটি ঝোপের মাথায় শুধু ফুল আর ফুল।

    মনুষ্যজাতির সব চাইতে নিচের স্তরের যে অংশটি সারা পৃথিবী থেকে ভয়ে ভয়ে দূরে সরে এসে এই মনপত্থলে ঘাড় গুঁজে পড়ে আছে তাদের কেউ এই মুহূর্তে জেগে থাকলে, চাঁপিয়াকে দেখে একেবারে হাঁ হয়ে যেত।

    দুসাদিন চাঁপিয়ার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। গায়ের রঙ পোড়া ঝামার মত। চুল উঠে উঠে কপালটা প্রকাণ্ড মাঠ হয়ে গেছে। নাকটা খাট এবং চাপা। থুতনিতে কাটা দাগের মত খাঁজ। মোটা ভুরু, খসখসে চামড়া। তবু লক্ষ্য করলে টের পাওয়া যায়, চাঁপিয়ার লম্বাটে মুখে এককালে খানিকটা ছিরিছাঁদ ছিল। এই বয়সেও তার চোখ দুটো বড় সরল, বড় নিষ্পাপ এবং টানা টানা। বিশ-পঁচিশ সাল আগে যখন চাঁপিয়া সবে নঈ যুবতী হয়ে উঠেছে, সেই সময় গঞ্জুটোলার ফেকুমল প্রায়ই বলত, তার চোখ নাকি বনহরণা অর্থাৎ বনহরিণীর মত। ছোকরা ছিল বেজায় ফুর্তিবাজ, আমুদে। নৌটঙ্কির দলে গান গাইত আর আজীব আজীব কথা বলে লোককে তাক লাগিয়ে দিত।

    বনহরণার মত চাঁপিয়ার চোখ হোক বা না হোক, তার গায়ে ছিল বনভৈসির তাকত। অসীম শক্তি আর অফুরন্ত স্বাস্থ্যই তাকে জীবনের লম্বা অনেকগুলো বছর এই পৃথিবীতে টিকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু তিন বছর আগে খারাপ জাতের চেচকে (বসন্তে) চাঁপিয়ার অটুট শরীর ভেঙে গেছে। কণ্ঠার হাড় গজালের মত ফুঁড়ে বেরিয়েছে। মুখে, ঘাড়ে, গলায় বসন্তের কালো কালো দাগ। হাতের শিরগুলো দড়ি হয়ে চামড়ার তলা থেকে ফুটে উঠেছে। আজকাল দুব্‌লা শরীরে অল্পতেই হাঁফ ধরে যায় তার।

    একটা রোগা ভাঙাচোরা চেহারার আধবুড়ি দুসাদিনের দিকে তাকিয়ে গঞ্জুরা, ধাঙড়রা বা দোসাদরা নিশ্চয়ই হাঁ হয়ে যাবে না। তাদের অবাক হওয়ার কারণ হল চাঁপিয়ার সাজগোজ। এই মুহূর্তে তার পরনে বাদরার ছাই (এক ধরনের ক্ষার) দিয়ে কাচা পরিষ্কার রঙিন একটা শাড়ি আর খাটো জামা। চোখে কাজলের লম্বা টান। চুলগুলো কাঠের কাকাই দিয়ে চুড়ো করে বেঁধে চারপাশে মনরঙ্গোলি ফুল বসিয়ে দিয়েছে। কপালের মাঝখানে মেটে সিঁদুরের ফোঁটা। গলায় চাঁদির হার, কানে চাঁদির করণফুল, হাতে চাঁদির কাঙনা। গত তিন সাল বড় কষ্টে গেছে চাঁদিয়ার, বহোত তখলিফ। কত দিন পেটে দানা পড়েনি, বিলকুল ভুখা থাকতে হয়েছে। তবু প্রাণ ধরে চাঁদির এই গহনা কটা সে যে বেচতে পারেনি তার কারণ একটাই। হাজার দুঃখেও চাঁপিয়ার আশা বা স্বপ্ন ছিল জীবন আরও একবার সে সাজাতে পারবে। আজ তার সেই সাজার দিন।

    সেই পনের বছর বয়স থেকে এখন পর্যন্ত মোট ছ’বার এভাবে সেজেছে চাঁপিয়া। মনপত্থলের অচ্ছুতেরা তাকে শেষবার সাজতে দেখেছে পাঁচ সাল আগে। সেবার চাঁপিয়া তার ছ’নম্বর মরদের ঘর করতে যায়।

    মনপত্থলকে ঘিরে দশ-বিশটা গাঁয়ে চাঁপিয়ার আরেক নাম ছেঘরিয়া অর্থাৎ চল্লিশ বছরের জীবনে মোট ছ’টি পুরুষের ঘর করেছে সে আজ পর্যন্ত।

    ঘরের দাওয়ায় বসে ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠতে থাকে চাঁপিয়া। চারপাশের দোসাটোলা, গঞ্জুটোলা, ধাঙড়টোলা, ঝাঁক ঝাঁক পরদেশি পাখি, পাল পাল শুয়োর, সিমার বা পরাস গাছের মাথায় থোকা থোকা আগুন, অনেক দূরে ধু-ধু ফাঁকা মাঠ—কোনদিকেই লক্ষ নেই তার। পাকা সড়কের ওপর চাঁপিয়ার দুই চোখ স্থির হয়ে আছে।

    কথা আছে, দু’মিল (দু’মাইল) পুবের ছোট টৌন ভকিলগঞ্জ থেকে সুরয উঠবার ঢের আগেই নাটোয়ার এসে তাকে নিয়ে সোজা চলে যাবে আড়াই ‘কোশ’ পশ্চিমে সুরথপুরার হাটে। নাটোয়ার তারই স্বজাত অর্থাৎ কিনা দোসাদ। বয়স কমসে কম পঞ্চাশ হবেই। ভকিলগঞ্জে এক ঠিকাদারের কাছে দিনমজুরিতে মাটি কাটে। ওদিকটায় এখন সড়ক তৈরির কাজ চলছে। তার জন্যই মাটি কাটা।

    দেখতে দেখতে চারদিক দ্রুত ফর্সা হতে থাকে। অনেক, অনেক দূরে আকাশ যেখানে পিঠ বাঁকিয়ে দিগন্তে নেমেছে, ঠিক সেইখানে লাল টকটকে সূর্যটা একটু একটু করে মাথা তোলে। ধাঙড়, গঞ্জু আর দোসাদটোলা থেকে মানুষজনের গলা ভেসে আসে। টের পাওয়া যায় মনপত্থল গাঁ জাগতে শুরু করেছে।

    সুরয উঠে গেল, অথচ এখনও নাটোয়ারের দেখা নেই। তবে কি সে আসবে না? ভাবতেই বুকের ভেতর চল্লিশ বছরের দুব্‌লা হৃৎপিণ্ড থমকে যায় চাঁপিয়ার। চোখ জলে ভরে যেতে থাকে। নাটোয়ার দোসাদ না এলে তার এত সাজ ব্যর্থ হয়ে যাবে।

    আরও খানিকক্ষণ পর সূর্য যখন দিগন্তের তলা থেকে লাফ দিয়ে ওপরে উঠে আসে, সে সময় দেখা যায় পাক্কী ধরে নাটোয়ার এদিকেই আসছে। বুকের ভেতর থমকান হৃৎপিণ্ড বিপুল বেগে ছোটাছুটি শুরু করে। খুশিতে চোখমুখ চকচকিয়ে ওঠে চাঁপিয়ার।

    একটু পরে ডাইনে এবং বাঁয়ে ধাঙড় আর গঞ্জুটোলা রেখে দোসাদটোলায় ঢুকে পড়ে নাটোয়ার। তারপর সামনের সিমার আর পরাস গাছগুলোর তলা দিয়ে সোজা চাঁপিয়ার কাছে এসে দাঁড়ায়। তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত সাজের বাহার দেখতে দেখতে শুধোয়, ‘কা রে চাঁপিয়া, রিডি?’ ‘রিডি’ মানে রেডি। চাঁপিয়া প্রস্তুত হয়ে আছে কি না তা জানতে চাইছে নাটোয়ার। ঠিকাদারদের কাছে কাজ করে দু-চারটে আংরেজি বুলি শিখে ফেলেছে সে। কথায় কথায় হরদম সেগুলো বেরিয়ে আসে।

    ‘হাঁ—’, আস্তে ঘাড় হেলিয়ে দেয় চাঁপিয়া। নাটোয়ারের দিকে ভাল করে তাকাতে পারে না সে। পনের ষোল বছরের নঈ যুবতী সে আর নেই। তবু তার বুক সুখে এবং লজ্জায় থির থির করে কাঁপতে থাকে।

    ‘আমার আসতে থোড়া দের হয়ে গেল।’

    চাঁপিয়া কী উত্তরে দেবে, ভেবে পেল না।

    নাটোয়ার ফের বলে, ‘আর দাঁড়িয়ে থেকে কী হবে। সুরয চড়ে যাচ্ছে। জলদি চল্। সুরথপুরার হাটিয়ায় পৌঁছতে দুফার হয়ে যাবে।’

    আবছা গলায় চাঁপিয়া বলে, ‘থোড়া ঠার যাও।’ বলেই তার ভাঙাচোরা ফুটোফাটা ঘরের ভেতর ঢুকে একটা পুঁটলি নিয়ে বেরিয়ে আসে। পুঁটলিটা কাল রাতেই বেঁধে-ছেঁদে রেখেছিল সে। ওটার ভেতর রয়েছে তার যাবতীয় পার্থিব সম্পত্তি। মোট খান দুই সেলাই করা খাটো বহরের শাড়ি, তিনটে ছেঁড়া জামা, একটা কাঁথা, একটা কম্বল আর সিলভারের তোবড়ানো দু-তিনটে থালা-গেলাস।

    নাটোয়ার পুঁটলিটার দিকে আঙুল বাড়িয়ে শুধোয়, ‘এটা নিয়ে যাবি?’

    ‘হাঁ—’, চাঁপিয়া মাথা নাড়ে।

    ‘ঠিক হ্যায়। চল্—’

    কয়েক পা এগিয়ে একবার পেছন ফেরে চাঁপিয়া। হেলে-পড়া টুটাফুটা ঘরটা একবার দেখে নেয়। এটা তার বাপের ঘর। অবশ্য বাপ আর বেঁচে নেই; কবেই মরে ফৌত হয়ে গেছে। শুধু কি বাপ, মা-বোন কেউ নেই তার। এক ভাই ছিল; সাদির পর অনেক দূরের ভারি টৌন ঝরিয়ায় চলে গেছে। সেখানে কয়লা খাদানে কাজ করত। দশ-বিশ সাল তার কোনও খবর পায় না চাঁপিয়া। মরে গেছে কী বেঁচে আছে, কে জানে।

    বাপের এই ঘর থেকে এই প্রথম যাবতীয় অস্থাবর সম্পত্তি কাঁখে নিয়ে একজন মরদের পিছু পিছু চলে যাচ্ছে না চাঁপিয়া। আগেও ছ’ ছ’বার পুরুষের সঙ্গে বেরিয়ে গেছে। যাবার সময় প্রতিবারই মনে মনে বলেছে, ‘হো রামজি, হো কিষুণজি, আর যেন আমাকে বাপের ঘরে ফিরতে না হয়।’ কিন্তু দো সাল, চার সাল পরপরই ছে-ঘরিয়া চাঁপিয়াকে ফিরে আসতে হয়েছে।

    এবার হল সপ্তম বার। ঘরটা দেখতে দেখতে মনে মনে হাত জোড় করে রামচন্দজি এবং কিষুণজির উদ্দেশ্যে চাঁপিয়া প্রার্থনা জানায়, এই যেন তার শেষ যাওয়া হয়।

    নাটোয়ার তাড়া লাগায়, ‘কী রে, দাঁড়িয়ে গেলি যে, দের নায় করনা—’

    ‘নায়—’ মুখ ফিরিয়ে নাটোয়ারের পিছু পিছু আবার হাঁটতে শুরু করে চাঁপিয়া। যেতে যেতে লক্ষ্য করে, হট্টাকট্টা চেহারার আধবুড়ো নাটোয়ারের সাজের বহরও আজ কম না। এমনিতে তার যা কাজ তাতে একরকম সারা দিনই মাটি মেখে পিরেত সেজে থাকে। কিন্তু আজ এর মধ্যেই সারা গায়ে প্রচুর তেল মেখে ‘নাহানা’ সেরে নিয়েছে নাটোয়ার। মাথায় এত কড়ুয়া তেল ঢেলেছে যে, এখনও কপাল বেয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে নামছে। তার পরনে ক্ষারে-কাচা সফেদ ধুতি আর লাল জামা। পায়ে কাঁচা চামড়ার ভারি জুতো, কানে পেতলের মাকড়ি। কাঁধের ওপর নতুন কোরা গামছা।

    দোসাদটোলা পেছনে ফেলে গঞ্জু আর ধাঙড়টোলার ভেতর দিয়ে দু’জনে এগিয়ে যেতে থাকে। এর মধ্যে মনপত্থল গাঁয়ের যাদেরই ঘুম ভেঙেছে দুলহনের সাজে চাঁপিয়াকে দেখে তারা তাজ্জব বনে যায়। জিজ্ঞেস করে, ‘কা রে চাঁপিয়া, নয়া মরদ মিলল হো?’

    মুখে কিছু বলে না চাঁপিয়া। চোখ নামিয়ে আস্তে মাথা নাড়ে শুধু।

    ‘এবার তা হলে সাতঘরিয়া হবি!’

    চাঁপিয়া চুপ।

    মনপত্থলের বয়স্ক মানুষজনেরা তার হিতাকাঙ্ক্ষী। তারা চেঁচিয়ে পরামর্শ দেয়, ‘দেখিস, এই সাদিটা যেন টুটে না যায়।’

    এর আগে ছ’ ছ’বার সাদি হয়েছে চাঁপিয়ার। ছ’বারই ভেঙে গেছে। মনে মনে তার ইচ্ছা শ্মশানে না চড়া পর্যন্ত এই সাদি যেন অটুটই থাকে। হো রামজি, হো কিষুণজি, তেরে কিরপা।

    একসময় দু’জনের মনপত্থল গাঁ থেকে বেরিয়ে সোজা পাক্কীতে এসে ওঠে; তারপর সুরথপুরা হাটের দিকে যেতে থাকে। গাঁয়ের ভেতর দিয়ে যখন আসছিল তখন দু’জনে আগে-পিছে হাঁটছিল। যে মরদের সঙ্গে এখনও সাদি হয়নি, গাঁয়ের মানুষের চোখের সামনে তার গা ঘেঁষে চলা যায় নাকি? শরম লাগে না? এই শরমটা নাটোয়ারের মধ্যেও কাজ করছিল খুব সম্ভব। গাঁয়ের ভেতরে বরাবর চাঁপিয়ার কাছ থেকে খানিকটা ফারাক রেখে চলেছে সে। কিন্তু পাকা সড়কে জান-পয়চান কেউ নেই। এখানে চাঁপিয়ার পাশাপাশি হাঁটতে অসুবিধা কোথায়?

    চলতে চলতে বারবার সঙ্গিনীর দিকে তাকায় নাটোয়ার। চাঁপিয়াও তার সঙ্গীকে আড়ে আড়ে দেখতে থাকে। এভাবে মাঝে মাঝে দু’জনের চোখাচোখি হয়ে যায়।

    হাজার হোক, চাঁপিয়া একটা রক্তমাংসের জীবন্ত আওরত। মনুষ্যজাতি সম্পর্কে তার বিপুল অভিজ্ঞতা। নাটোয়ারের তাকানো দেখে এক লহমায় বুঝে নেয়, তাকে ‘পুরুখ’ বা পুরুষটার মনে ধরেছে।

    চাঁপিয়ার মনে পড়ে, প্রথমবার ছাড়া বাকি পাঁচবারই এভাবে একটা করে পুরুষের সঙ্গে সুরথপুরার হাটে গেছে। প্রথমবার যেতে হয়নি, তার কারণ তখন বাপ বেঁচে ছিল। সে-ই চারপাশের দশ-বিশটা তালুক চষে মনপছন্দ একটা ছেলে খুঁজে এনে তার সাদি দেয়। বিয়ের পর মনপত্থল থেকে আট ‘মিল’ উত্তরে হাথিয়াগঞ্জে মরদের ঘর করতে চলে যায় চাঁপিয়া।

    জীবনের প্রথম ‘পুরুখ’ মুঙ্গিলাল ছিল বড়ই সাদাসিধে ভাল মানুষ গোছের আদমী। সংসারে সে আর তার একটা বুড়ি পিসী ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। এক রাজপুত ক্ষত্রিয়ের জমিতে মুঙ্গিলাল ছিল কামিয়া অর্থাৎ খরিদী কিষাণ। তার নানা জমি-মালিকের কাছ থেকে কোরা কাগজে অঙ্গুঠার ছাপ মেরে টাকা করজ নিয়েছিল। সে টাকা নিজে আর শোধ করে যেতে পারেনি। ফলে বাকি জীবন নানাকে মালিকের জমিতে স্রেফ পেটভাতায় ঘাড় গুঁজে খেটে যেতে হয়েছে। নানার পর বাপ মৃত্যু পর্যন্ত ঐ মালিকেরই জমি চষে গেছে। তারপর মুঙ্গিলালের পালা। কিন্তু সুদে-আসলে করজের টাকা ফুলেফেঁপে এতই বিরাট হয়ে উঠেছে যে, তিন পুরুষ ধরে অবিরত খেটেও শোধ করা যাচ্ছিল না।

    সাদির পর চাঁপিয়াকেও মালিকের ক্ষেতির কাজে লাগিয়ে দিয়েছিল মুঙ্গিলাল। দু’জনে খেটে যত তাড়াতাড়ি কামিয়াগিরি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, এই ছিল তার ইচ্ছা। কিন্তু দুটো সাল ঘুরতে না ঘুরতেই দশ দিনের ‘বোখারে’ হঠাৎ মরে গেল মুঙ্গিলাল। মরদের মৃত্যুশোক সামাল দিয়ে উঠতে না উঠতে মালিকের মুনশি আধবুড়ো পিঠবাঁকা চিমসে চেহারার টেড়ারাম সহায় একদিন রাত্রে তার কাছে এসে ফিসফিসিয়ে একটা প্রস্তাব দেয়। সে তাকে ‘রাখনি’ (রক্ষিতা) করতে চায়। এমনি এমনি মুফতে না। রীতিমত সপরনার (সাজসজ্জা) জিনিস দেবে। নয়া শাড়ি দেবে, চাঁদির গয়না দেবে, এ ছাড়া পাইসা-রুপাইয়া তো আছেই।

    অচ্ছুৎ ভূমিদাসদের ঘরের যুবতী মেয়েদের মালিক এবং তাদের লোকেরা চিরদিন ভোগদখল করে এসেছে। আবহমান কাল ধরে এ অঞ্চলে এ একটা চালু-প্রথা। এর বিরুদ্ধে কেউ কখনও মাথা তুলে দাঁড়ায়নি। কিন্তু চাঁপিয়া অন্য ধাতের তেজী মেয়ে। তা ছাড়া মুঙ্গিলালের শোকটা তখনও তার মনে বড়ই টাটকা। আচমকা তার মাথায় কী যেন হয়ে যায়। ‘বুড়হা গিধ, তুহারকা মুহ্‌মে থুক থুক থুক—’ গালাগাল দিয়ে এবং টেড়ারামের মুখে গুনে গুনে তিনবার থুতু ছিটিয়েই চাঁপিয়ার হুঁশ হয়, হাথিয়াগঞ্জে আর থাকা ঠিক হবে না। টেড়ারাম তাকে নির্ঘাত খুন করে ফেলবে।

    একমুহূর্তও না দাঁড়িয়ে চাঁপিয়া রুদ্ধশ্বাসে ছুটতে শুরু করে এবং রাতারাতি ক্ষেতির পর ক্ষেতি পেরিয়ে সোজা মনপত্থলে বাপের ঘরে ফিরে আসে।

    বাপ গণপৎ দোসাদ কমজোরি মানুষ। সে ছিল মরসুমি কিষাণ। ধান কি গেঁহু চাষের সময় আর ফসল কাটার মরসুমে দেড় আর দেড় মোট তিনটে মাস সে কাজ পেত। বাকি ন’ মাস দক্ষিণ কোয়েলের পাড়ে যে মাইলের পর মাইল জুড়ে জঙ্গল পড়ে আছে সেখান থেকে সুথনি (একজাতীয় কন্দ), রামদানা, মেটে আলু বা মহুয়ার গোটা তুলে এনে খেয়ে জীবন বাঁচাত। মুঙ্গিলালের সঙ্গে সাদির আগে বাপের পিছু পিছু খাদ্যের খোঁজে কতবার সে ঐ জঙ্গলটায় গেছে। হাথিয়াগঞ্জ থেকে ফেরার পর রোজই সেখানে যেতে লাগল চাঁপিয়া।

    দিন কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু চাঁপিয়ার বরাত এমনই, মুঙ্গিলালের মৃত্যুর পর ছ’মাস ঘুরল না, বাপটা মরে ফৌত হয়ে গেল।

    দুব্‌লা হোক, বুড়হা হোক, হাজামজা হোক, তবু মাথার ওপর একটা বাপ ছিল। সে চোখ বোজার পর রাতের অন্ধকারে কারা যেন ঘরের বেড়া আঁচড়াতে আর চাপা গলায় বলত, ‘দরবাজা খোল চাঁপিয়া। তোর জন্যে লাড্ডুয়া এনেছি, বুনিয়া এনেছি, চাঁদির করণফুল এনেছি—’

    বাপ মরার পর থেকেই শিয়রের কাছে একটা বাঁকানো দা নিয়ে শুতো চাঁপিয়া। দা’টা বাগিয়ে বিছানায় উঠে বসে সে গলার শির ছিঁড়ে চেঁচাত, ‘ভাগ যা চুহাকা ছৌয়ারা। নইলে জানে খতম হয়ে যাবি।’

    কিন্তু উৎপাতটা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছিল। অতিষ্ঠ চাঁপিয়া শেষ পর্যন্ত মনপত্থলের পঞ্চ-এর কাছে গিয়ে নালিশ জানায়। ‘পঞ্চ’-এর যে মাথা সে হল গঞ্জুটোলার বুড়ো ধানপত। সব শুনে সে বলেছিল, যুবতী ছোকরির অরক্ষিত থাকা ঠিক না। চাঁপিয়ার উচিত তুরন্ত আরেকবার সাদি করে ফেলা। বেশির ভাগ ‘পুরুখে’র (পুরুষের) মধ্যেই রয়েছে একটা করে জানবর। চাঁপিয়ার শরীরে এবং মনে তাকত কতটুকু? জানবরেরা তাকে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে।

    ধানপত ভাল লোক, বহোত সাচ্চা আদমী। তার কথাগুলো ফেলে দেবার মত নয়। চাঁপিয়া বলেছিল, ‘লেকেন আমি একঘরিয়া রাণ্ডি, আমাকে কে সাদি করবে?’

    ধানপত বলেছিল, ‘কা তাজ্জবকা বাত! আমাদের অচ্ছুতিয়াদের ঘরে একঘরিয়াদের নতুন করে সাদি হয় না! কেত্তে দোঘরিয়া চারঘরিয়া দশঘরিয়া চুমৌনা (সাঙ্গা) করে সম্‌সার করছে।’

    কথাটা চাঁপিয়ার অজানা নয়। দোসাদ সমাজের যাবতীয় প্রথাই সে জানে। নিজের দ্বিতীয়বার সাদির প্রসঙ্গে ঠিক ওভাবে সে বলতেও চায়নি। দ্রুত শুধরে নিয়ে সে এবার বলেছে, ‘জানি চাচা। লেকেন আমি একটা লেড়কি, মাথার ওপর বাপ নেই। কোই ভি নায়। লোকের দরজায় দরজায় ঘুরে কি বলতে পারি আমাকে সাদি কর। শরমকা বাত।’

    ‘তুই রাজি থাকলে বল্। আমি ব্যওস্থা করব।’

    ‘তোমার যা ‘আচ্ছা’ মনে হয়, কর।’

    কয়েক দিনের মধ্যেই পাশের তালুক দুধলিগঞ্জ থেকে আধবুড়ো এক দোসাদকে এনে হাজির করেছিল ধানপত। লোকটার নাম চৌপটলাল। দু’জনের আলাপ-টালাপ করিয়ে দিয়ে ধানপত জানিয়েছিল, চৌপট পাক্কীতে সাইকেল রিকশা চালায়। আগে দু’বার বিয়ে করেছে। এক বউ মারা গেছে বোখারে, আরেক বিয়ে ‘ছুট’ হয়ে গেছে। ছেলেপুলে নেই, ঝাড়া হাত-পা লোক। চাঁপিয়াও তা-ই। এই চুমৌনা হলে দু’জনের পক্ষেই ভাল।

    চাঁপিয়া মুখ নামিয়ে ধানপতকে শুধিয়েছে, ‘চাচা, রিকশা গাড়িয়াটা কি ওর নিজের?’

    চৌপটলাল প্রশ্নের উত্তরটা ধানপতকেই দিয়েছে, ‘ওকে বলে দাও চাচা, ওটা মালিকের। রোজ চার রুপাইয়া তাকে কেরায়া দিতে হয়। তারপর যা থাকে সেটা আমার কামাই।’ একটু থেমে ফের বলেছে, ‘আউর একগো বাত ধানপত চাচা।’

    ধানপত জানতে চেয়েছে, ‘কা বাত?’

    ‘তোমাদের লড়কীকে জানিয়ে দাও’ আমার কামাইয়ের দিকে যেন নজর না দেয়। চুমৌনা হলে নিজের পেটের দানা নিজেকেই ওর জুটিয়ে নিতে হবে। আমার পেটের সওয়াল আমার, ওর পেটের সওয়াল ওর। রাজি হলে এ চুমৌনা হবে।’

    ‘লেকেন তোর ঘরে গিয়ে নয়া জায়গায় চাঁপিয়া নিজের ব্যওস্থা কী করে করবে?’

    ‘সেটা আমি দেখব। রাজি কিনা তুমি ‘পুছে’ নাও—’

    ধানপত উত্তর দেবার আগেই চাঁপিয়া বলে উঠেছে, ‘আমি রাজি।’ আসলে একা একা থাকতে তার সাহস হচ্ছিল না; একটি পুরুখের আশ্রয় তার প্রয়োজন ছিল।

    এবার সোজাসুজি তার দিকে তাকিয়ে চৌপটলাল বলেছে, ‘তা হলে কাল সুবে সাফা কাপড়া-টাপড়া পরে থেক। আমি এসে তোমাকে নিয়ে যাব।’

    ধানপত শুধোয়, ‘কোথায় নিয়ে যাবি?’

    চৌপটলাল বলে, ‘সুরথপুরার হাটিয়ায়।’

    ‘সেখানে কী?’

    চৌপটলাল যা উত্তর দেয় তা এই রকম। তখন চাষের মরসুম। চারপাশের দশ-বিশটা গাঁয়ের যত জমির মালিক আছে, তাদের সবার ক্ষেতিমজুর দরকার। সুরথপুরার হাটিয়ায় এ অঞ্চলের তাবৎ ভূমিহীন মেয়েপুরুষ এই সময়টা গিয়ে জড় হয়। জমির মালিকেরা তাদের ভেতর থেকে শক্তসমর্থ দেখে মজুর বেছে নিয়ে যায়। তেমন তেমন খাটিয়ে হলে মালিকের কাছে সালভর কাজ পাওয়া যায়। কাজের বদলে মেলে চাল, গেঁহু বা বজরা আর নগদ কিছু পাইসা। চাঁপিয়াকে যদি পসন্দ করে কোনও জমির মালিক কাজ দেয়, চৌপটলাল তাকে নিজের ঘরে নিয়ে তুলবে।

    ধানপতের সন্দেহ হয়েছিল। সে শুধিয়েছে, ‘তোর মতলব কী রে? চাঁপিয়াকে রাখনি বানিয়ে ঘরে বসাতে চাস?’

    তাড়াতাড়ি জিভ কেটে কানে হাত দিয়ে চৌপটলাল বলছে, ‘নায় নায় চাচা। ওরকম পাপকা চিন্তা মনে এনো না। তোমাদের লড়কী ক্ষেতিমালিকের কাম পেলেই চুমৌনার ব্যওস্থা করে ফেলব। তারপর ওকে ঘরে নিয়ে যাব। তবে একটা কথা—’

    ‘কা?’

    ‘কাম না পেলে কিন্তু চুমৌনা হবে না। তোমাদের লড়কীকে সুরথপুরার হাটিয়ে থেকে ফিরে আসতে হবে।’

    ধানপতকে বিষণ্ন দেখিয়েছিল। চাঁপিয়ার দিকে ফিরে সে শুধিয়েছে, ‘কা রে রাজি? ভাল করে ভেবে দ্যাখ।’

    চাঁপিয়া বলেছে, ‘ভাবনার কিছু নেই। আমি রাজি।’

    কথামত পরের দিন ভোরে কোয়েলের হাঁটুভর জলে ‘নাহানা’ চুকিয়ে সেজেগুজে গয়না পরে নিজের ঘরে দাওয়ায় বসে থেকেছে চাঁপিয়া। মুঙ্গিলালের সঙ্গে পয়লা সাদির সময় বাপ অনেক চাঁদির গয়না দিয়েছিল। সে সব নিয়ে আসতে পারেনি সে। এক কাপড়ে তাকে মুঙ্গিলালদের গাঁ থেকে পালিয়ে আসতে হয়। পরে অবশ্য বুড়ি পিসীশাশুড়ি তার কাপড়জামা গয়নাগাটি, সব কিছু নিজে এসে দিয়ে গেছে।

    যাই হোক, সুরুয উঠবার আগেই চৌপটলাল এসে চাঁপিয়াকে সঙ্গে করে সুরথপুরার হাটে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে এক ক্ষেতিমালিক তাকে দেখামাত্র পছন্দ করে ফেলে এবং সালভর কাজের ব্যবস্থা পাকা হয়ে যায়।

    চৌপটলাল মরদকা ছৌয়া। তার বাত হাতিকা দাঁত। ঐ হাটিয়াতেই অচ্ছুতিয়াদের বামহন ডেকে চুমৌনা সেরে নয়া বহুকে নিয়ে দুধলিগঞ্জে চলে যায়।

    চৌপটলালের সঙ্গে তার বিবাহিত জীবনের আয়ু মোট চার সাল। এই কটা বছর মোটামুটি ভালই কেটেছে। শর্তানুয়ায়ী চৌপটলাল আর চাঁপিয়া নিজের নিজের পেটের দানা যোগাড় করত। তাদের জীবনে কোনরকম ওঠানামা ছিল না। রোজ ভোরে উঠে বাসি রোটি কি পানিভাত্তা (পান্তাভাত) খেয়ে চুলা ধরিয়ে কালোয়া (দুপুরের খাবার) বানিয়ে নিত চাঁপিয়া। দুটো তোবড়ান সিলভারের কটোরায় কালোয়া ভরে একটা দিত চৌপটলালকে, একটা নিত নিজে। তারপর দু’জনে চলে যেত দু’দিকে। চাঁপিয়া মালিকের খামারে কিংবা ক্ষেতিতে। চৌপটলাল যেত সাইকেল রিকশা নিয়ে পাক্কীতে। সারা দিন পর রাত্রিবেলা দু’জনের দেখা হত। গরম গরম মাড়ভাত্তা বা লিট্টি বানিয়ে খাওয়া-দাওয়া চুকিয়ে ঘন হয়ে পাশাপাশি শুয়ে ঘরের ফুটো ছাউনির ফাঁক দিয়ে আকাশ আর তারার মেলা দেখতে দেখতে কত যে গল্প করত চৌপটলাল।

    চাঁপিয়ার এই চার বছরের বিবাহিত জীবনের একটা বড় ঘটনা হল এক মরা বাচ্চার জন্মদান। এটুকু বাদ দিলে মনে হচ্ছিল, দিন এভাবেই কেটে যাবে।

    কিন্তু চার সাল বাদে এদিকে এমন মারাত্মক খরা হয় যে মাইলের পর মাইল সব চাষের জমি টুটেফুটে গেল। না এক ফোঁটা মেঘ, না এক বুঁদি বারিষ। আকাশের চেহারা দেখে এদিকে আদৌ কোনও দিন যে বৃষ্টি নামবে, এমন ভরসা পাওয়া গেল না। জল না হলেও চাষও নেই। ক্ষেতিমালিক জানিয়ে দিল, সে আর চাঁপিয়াকে রাখতে পারবে না।

    কাজটা চলে যাবার পর চৌপটলাল নিরানন্দ মুখে বলেছিল, ‘মনমে বহোত দুখ হচ্ছে। তবু কথাটা তোকে বলতেই হয়।’

    ‘কা?’ ভয়ে ভয়ে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়েছে চাঁপিয়া।

    ‘তুই মনপত্থলে ফিরে যা।’

    ‘ফিরে যাব!’

    ‘হাঁ।’ বিষণ্নভাবে মাথা নেড়েছে চৌপটলাল, ‘তোর কাম নেই, কামাই বন্দ। এই খরার সময় মানুষের পয়সা নেই; কেউ রিকশ গাড়িয়ায় চড়তে চায় না। দিনভর আমার যা কামাই তাতে আমারই চলে না। তুই থাকলে দু’জনেই ভুখা মরে যাব।’

    অগত্যা কাটান-ছাড়ান হয়ে গেল। নিজস্ব জামাকাপড় আর চাঁদির গয়নাগুলো নিয়ে চোখের জলে বুক ভাসাতে ভাসাতে আবার মনপত্থলে ফিরে এল চাঁপিয়া।

    বাপের ঘরটা অনেক দিন ফাঁকা পড়ে ছিল। মানুষজন না থাকায় হাঁটুভর ধুলোবালি আর জঞ্জাল জমে উঠেছিল সেখানে। সাগুয়ান কাঠের খুঁটিতে ঘুণ ধরে এমন ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল যে, ঘরটা হুড়মুড় করে যেকোন সময় পড়ে যেতে পারত। জঞ্জাল সাফসুতরো করে, জঙ্গল থেকে কাঠ জুটিয়ে এনে খুঁটিগুলো বদলে নিয়েছিল চাঁপিয়া।

    এরপর একটা বছর বড়ই কষ্টে কেটেছে তার। চৌপটলালদের ওখানেই শুধু খরা হয়নি, মনপত্থলের চারপাশের চল্লিশ পঞ্চাশটা তালুকের তাবৎ জমি রোদে জ্বলে গিয়েছিল। বারিষের অভাবে চাষবাস যখন বন্ধ, তখন চাঁপিয়ার মত মানুষদের কাজও বন্ধ। কাজেই দক্ষিণ কোয়েলের মরা খাতের দু’ধারের জঙ্গলটাই ওদের একমাত্র ভরসা। সেখান থেকে রোজ মহুয়ার গোটা, রামদানা আর সুথনি জোগাড় করে এনে সে সব সেদ্ধ করে খেয়ে কিভাবে যে পুরা একটা সাল কাটিয়ে দিয়েছে তা একমাত্র চাঁপিয়াই জানে। তার জীবনশক্তি যে প্রবল, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। নইলে এই সব কচুঘেঁচু আগাছা খেয়ে কেউ বেঁচে থাকতে পারে!

    এক বছর বাদে আকাশের দেওতা মুখ তুলে চাইল। জেঠ মাহিনা শেষ হতে না হতেই চারপাশ ঘন কাল মেঘে ছেয়ে গেল। চাঁপিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে মাথায় ঠেকিয়েছে আর বলেছে, ‘হে রামজি, হো কিষুণজি, তেরে কিরপা। কাম মিললে ভাত খেতে পাব। এক সাল ভাতের মুখ দেখি না।’

    চাঁপিয়া ঠিক করে ফেলেছিল, দু-এক রোজের ভেতর সুরথপুরার হাটে গিয়ে সেই কড়াইয়া গাছগুলোর তলায় বসবে। ওখান থেকেই চারপাশের ক্ষেতি মালিকেরা মরসুমি কিষাণ জুটিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু যেদিন সে হাটে যাবে তার আগের দিন পাশের গাঁ হাতিয়াড়া থেকে জগন দোসাদ এসে হাজির। সুরথপুরার হাটে ধানচালের আড়তে সে মাল বয়। জগন বলেছিল, ‘হামনি শুনা হ্যায়, তুহারকা ঘরমে মরদ নেহী। চৌপটলালের সাথ তোর সাদি টুটে গেছে।’

    জগন দোসাদকে ছোটবেলা থেকেই চিনত চাঁপিয়া। বাপ বেঁচে থাকতে প্রায়ই মনপত্থলে আসত সে। চাঁপিয়া ঘাড় কাত করে জানিয়েছিল, ‘হ্যাঁ।’

    ‘আমার ঘরেও জেনানা নেই। তোর মন হলে আমার ঘরে আসতে পারিস। মগর—’

    জগন দোসাদের প্রস্তাবটি বুঝতে অসুবিধা হয় না চাঁপিয়ার। একটা তাগড়া তাকতওয়ালা জোয়ান মরদ যেচে এসে তাকে বিয়ের কথা বলছে শুনেও বুকের ভেতরটা উথালপাথল হয়ে ওঠে না। শান্ত চোখে জগনের দিকে তাকিয়ে নিরুত্তাপ গলায় সে শুধিয়েছে, ‘মগর কা?’

    জগন এবার যা বলেছে তা এই রকম। চাঁপিয়াকে সে নিজের ঘরে নিয়ে যেতে পারে একটিমাত্র শর্তে। কামাই করে নিজের পেটের দানা তাকে জোটাতে হবে।

    এমন শর্ত চাঁপিয়ার অজানা নয়। এই কড়ারেই আগের বিয়েটা হয়েছে তার। সে বলেছে, ‘ঠিক হ্যায়।’ এ দেশের নিয়ম এবং সংস্কার অনুযায়ী চাঁপিয়া বুঝে নিয়েছে, সব ঔরতের জন্যই একটা করে পুরুখের প্রয়োজন। সে খেতে পরতে না দিক, অন্য নিরাপত্তার জন্যও তাকে একান্ত দরকার। মেয়েদের পক্ষে একা বেওয়ারিশ পড়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক।

    জগন এবার খুশি হয়ে বলেছে, ‘এহি সাল আসমানে ঘটা দেখে ক্ষেতিমালিকেরা সুরথপুরার হাটিয়ায় কিষাণ নিতে আসছে। ওখানে গেলেই কাম জুটে যাবে।’

    ‘জানি। আমি কাল সুরথপুরা যাব।’

    জগনের উৎসাহ এবার দশ গুণ বেড়ে গিয়েছিল। সে বলেছে, ‘কাল সুবে তোর এখানে চলে আসব। হামনিলোগন একসাথ সুরুথপুরায় চলে যাব।’

    ‘ঠিক হ্যায়।’

    ‘তোর কাম জুটলে তোকে আমরা ঘরে নিয়ে যাব।’

    পরের দিন ভোরে সুরয উঠবার আগে মনপত্থলের তাবৎ মানুষ দেখল চাঁপিয়া আরও একবার সেজেগুজে হাতিয়াড়া গাঁয়ের জগন দোসাদের পিছু পিছু সুরথপুরার হাটে চলেছে।

    কড়াইয়া গাছের তলায় গিয়ে বসতে না বসতেই কাজ জুটে গিয়েছিল চাঁপিয়ার। ফলে চৌপটলাল যা যা করেছে এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। জগন কোত্থেকে এক টিকিওলা পণ্ডিত ধরে এনে নগদ পাঁচ টাকা দক্ষিণা দিয়ে বিয়েটা চুকিয়ে ফেলে। তারপর চাঁপিয়াকে নিয়ে সিধা নিজের ঘরে চলে যায়।

    চাঁপিয়ার এই তিন নম্বর বিয়ের আয়ু পুরো দুই সালও নয়। পয়লা বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পেটে ছৌয়া এসে গেল। কিন্তু সে জন্য কাজ বন্ধ করা যায় না। নায় কাম তো নায় খোরাকি। কাজেই ন’ ম