সপ্তাহের সেরা

    আখ্যাত রচনা

    ‘বাংলার অক্সফোর্ড’ নবদ্বীপ : একটি বহুপ্রচলিত মিথের বিনির্মাণ

    নানা দেশ হৈতে লোক নবদ্বীপ যায়।

    নবদ্বীপে পড়িলে সে বিদ্যারস পায়॥

    অতএব পড়ুয়ার নাহি সমুচ্চয়।

    লক্ষ কোটি অধ্যাপক নাহিক নির্ণয়॥

    বৃন্দাবন দাস-রচিত চৈতন্য ভাগবত-এর পঙ্‌ক্তি চতুষ্টয়ে নিঃসন্দেহে অতিশয়োক্তি আছে। তবে পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীতে দেশের নানা জায়গা থেকে বহু মানুষ যে বিদ্যাশিক্ষার জন্য নবদ্বীপে হাজির হতেন, সেটি কোনও অতিশয়োক্তি নয়। বলা বাহুল্য, বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রে নবদ্বীপের এই দেশজোড়া খ্যাতি রাতারাতি ছড়িয়ে পড়েনি। অষ্টম-নবম শতকে পাল রাজাদের আমলে রাঢ় বাংলায় কয়েকটি বিদ্যাচর্চা কেন্দ্র গড়ে ওঠে। অনেকে মনে করেন, এই সময়েই নবদ্বীপের নিকটবর্তী সুবর্ণবিহারে বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বৌদ্ধবিহারে বৌদ্ধধর্ম ও দর্শনের পঠন-পাঠন হত। গবেষকদের অনুমান, বৌদ্ধধর্মের অবনতির সময়ে বিহারটির পতনের পরে, এই অঞ্চলের ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা কালক্রমে বৌদ্ধদের দর্শন ও ন্যায়শাস্ত্রের সারাংশ আয়ত্ত করে ন্যায় ও স্মৃতি চর্চা শুরু করেন। কাজেই এই সময় থেকে জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে নবদ্বীপের জয়যাত্রা শুরু হয় বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে।

    একাদশ-দ্বাদশ শতকে সেন রাজাদের শাসনকালে নবদ্বীপে বহু পণ্ডিতের বাসস্থান ছিল। ১২০৬ সালে রাজা লক্ষ্মণসেনের পরাজয় ও নবদ্বীপ ত্যাগের পরে এই অঞ্চল মুসলমান শাসকদের অধীনে আসে। এর পর প্রায় দুশো বছর নবদ্বীপের শিক্ষাদীক্ষা ও সাহিত্যচর্চার ইতিহাস সম্পর্কে প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় না। যদিও সে সময়ে নবদ্বীপে বিদ্যাচর্চা সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়— এ কথা মনে করা সঙ্গত নয়। কারণ এই দীর্ঘ সময়ে জ্ঞানচর্চার ধারা অব্যাহত না থাকলে পঞ্চদশ শতকে সহসাই নবদ্বীপে এই পরিমাণ প্রথম সারির পণ্ডিতের উপস্থিতি আদৌ সম্ভব নয়। তাই অনুমান করা যায়, সেন আমলে নবদ্বীপে বসবাসকারী পণ্ডিতদের উত্তরসূরীরা ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকে শাসকগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিদ্যাচর্চায় নিরন্তর নিয়োজিত ছিলেন। অতঃপর পঞ্চদশ শতক থেকে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে শাসকবর্গের যুগপৎ উদারতা প্রদর্শন ও আর্থিক আনুকূল্যের ফলে প্রধানত নবদ্বীপকে কেন্দ্র করে সারা বাংলায় ন্যায়, নব্যন্যায়, স্মৃতি, তন্ত্রশাস্ত্র, জ্যোতিষ ও সামগ্রিকভাবে সংস্কৃত চর্চার বিকাশ ঘটে।

    বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলা চলে, পঞ্চদশ শতকের প্রথম ভাগে নরহরি বিশারদ নবদ্বীপে সর্বপ্রথম চতুস্পাঠী স্থাপন করে ন্যায়, স্মৃতি ও বেদান্তের অধ্যাপনা শুরু করেন। এই সময়ে শ্রীহট্ট থেকে শ্রীচৈতন্যের মাতামহ নীলাম্বর চক্রবর্তী, রাজপণ্ডিত সনাতন মিশ্র ও আরও অনেকে নবদ্বীপে আসেন। কৃষ্ণদাস কবিরাজের শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত থেকে জানা যায়, এঁদের মধ্যে স্মৃতি ও জ্যোতিষ শাস্ত্রের অধ্যাপক নীলাম্বর চক্রবর্তী ছিলেন নরহরি বিশারদের সহপাঠী। এই শতাব্দীর দ্বিতীয় পাদে (আনুমানিক ১৪৪৫ সালে) নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন বিখ্যাত পণ্ডিত বাসুদেব সার্বভৌম। সার্বভৌম তাঁর পিতা নরহরি বিশারদের কাছে ন্যায় ও বেদান্ত অধ্যয়ন করে কালক্রমে স্মৃতি, ন্যায়, ন্যায়বৈশেষিক, মীমাংসা ও বেদান্ত শাস্ত্রে সুপণ্ডিত হয়ে ওঠেন। পরিণত বয়সে তিনি ওড়িশারাজ পুরুষোত্তম দেবের সভাপণ্ডিত হন এবং পুরীতে শ্রীচৈতন্যের সংস্পর্শে এসে অন্যতম প্রধান চৈতন্যভক্ত হয়ে ওঠেন।

    বাসুদেব সার্বভৌমের পরে নবদ্বীপের অন্যতম প্রধান পণ্ডিত হিসেবে বিবেচিত রঘুনাথ শিরোমণি শ্রীচৈতন্যের প্রায় ৪০ বছর আগে শ্রীহট্টে জন্মগ্রহণ করেন। রাজা সুবিদনারায়ণের খঞ্জা কন্যাকে বিবাহ করে রঘুনাথের জ্যেষ্ঠ সহোদর রঘুপতি প্রচুর ভূসম্পত্তির অধিকারী হন। এই বিবাহে ক্রুদ্ধা হয়ে তাঁর জননী সীতা দেবী দ্বিতীয় পুত্র রঘুনাথকে নিয়ে শ্রীহট্ট ত্যাগ করেন এবং নিঃস্ব অবস্থায় নবদ্বীপে নৈয়ায়িক বাসুদেবের গৃহে আশ্রয় নেন। যদিও এই বাসুদেবই সুবিখ্যাত বাসুদের সার্বভৌম কি না, সে বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে। ইতিহাসবিদ যজ্ঞেশ্বর চৌধুরীর মতে, বাসুদেব সার্বভৌমের কাছে ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়ন করেই রঘুনাথ মহানৈয়ায়িক হন।[১] অন্য দিকে দীনেশচন্দ্র সেন জানিয়েছেন: “সুবিস্তৃত বৈষ্ণব সাহিত্যে, চৈতন্য-চরিতামৃত, চৈতন্য-ভাগবত, চৈতন্য-মঙ্গল প্রভৃতি চরিতাখ্যানে— কোথায়ও রঘুনাথ শিরোমণির নামের উল্লেখপর্যন্ত নাই। বাসুদেব সার্ব্বভৌম-সংক্রান্ত নানা কাহিনী বৈষ্ণব গ্রন্থগুলিতে বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ হইয়াছে, তাহার কোনটিতে প্রাসঙ্গিক ভাবে রঘুনাথের সঙ্গে সার্ব্বভৌমের কোন সংশ্রব সূচিত হয় নাই। রঘুনাথ শিরোমণি তাৎকালিক নবদ্বীপের পণ্ডিতগণের মধ্যে দিক্‌পালস্বরূপ ছিলেন— বৈষ্ণব-সাহিত্য তৎসম্বন্ধে একেবারে নীরব। এতদ্বারা সহজেই মনে হয়, তিনি বৈষ্ণবদিগের কিংবা বাসুদেব সার্ব্বভৌমের কেহ ছিলেন না।”[২] তবে রঘুনাথ শিরোমণিই যে বাংলায় নব্যন্যায়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং তাঁর সুবাদেই যে নবদ্বীপ বিদ্যাসমাজের ভারতজোড়া খ্যাতি, এ বিষয়ে কোনও মতভেদের অবকাশ নেই।

    বাসুদেব সার্বভৌম ও রঘুনাথ শিরোমণির আবির্ভাবের ফলে নব্যন্যায়ের পঠন-পাঠন, গ্রন্থ রচনা ও ন্যায়শাস্ত্রের টীকা রচনায় নবদ্বীপের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন হলেও যাঁর সুবাদে ষোড়শ শতকের শেষার্ধে স্মৃতিশাস্ত্রের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে নবদ্বীপের খ্যাতি তুঙ্গে ওঠে, তিনি হলেন স্মৃতিকারদের প্রধানতম ব্যক্তি ও ‘বাংলার মনু’ হিসেবে বিবেচিত রঘুনন্দন ভট্টাচার্য। মহামহোপাধ্যায় পি. ভি. কাণের মতে, রঘুনন্দন ১৫২০ সালে নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। স্মার্ত পণ্ডিত হরিহর ভট্টাচার্যের পুত্র ও বিখ্যাত স্মার্ত পণ্ডিত শ্রীনাথ আচার্যের সুযোগ্য ছাত্র রঘুনন্দন অষ্টাবিংশতি স্মৃতিতত্ত্ব রচনা করে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর এই বিখ্যাত গ্রন্থের ‘দায়ভাগতত্ত্ব’, ‘প্রায়শ্চিত্ততত্ত্ব’ এবং ‘একাদশীতত্ত্ব’ বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে।

    তবে কেবল ন্যায় ও স্মৃতি চর্চাই নয়, তন্ত্রশাস্ত্র চর্চার ক্ষেত্রেও নবদ্বীপের পণ্ডিতেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মহেশ্বর গৌড়াচার্যের জ্যেষ্ঠ পুত্র কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ ভট্টাচার্যের সুবাদে নবদ্বীপে আগমশাস্ত্র বা তন্ত্রশাস্ত্র চর্চা শুরু হয়। কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ ষোড়শ শতকের শেষভাগে অথবা সপ্তদশ শতকের প্রথম দশকে জন্মগ্রহণ করেন। তন্ত্রশাস্ত্রে সুপণ্ডিত আগমবাগীশ প্রায় ১৭০টি মূলতন্ত্র ও উপতন্ত্র থেকে মূল নির্যাস গ্রহণ করে প্রামাণ্য গ্রন্থ বৃহৎ তন্ত্রসার রচনা করেন। এই মহামূল্যবান গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল, এই সংকলন গ্রন্থে শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব, সৌর ও গাণপত্য সম্প্রদায়ের তন্ত্রগুলির সারবস্তু লিপিবদ্ধ করা হয়।

    ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের পরে, ব্রিটিশ শাসকরা বাংলা ও বাংলার বাইরে শিক্ষাবিস্তারের উদ্ভব ও বিকাশ স্থল মধ্যযুগের নবদ্বীপকে ‘Oxford of Bengal’ আখ্যায় ভূষিত করা শুরু করেন। এহেন বিশেষণের পেছনে ঔপনিবেশিক শাসকদের মূল প্রতিপাদ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অক্সফোর্ডের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা। দুঃখজনক হলেও এ কথা সত্যি, নবদ্বীপ তথা বাংলার বাসিন্দারা এই অভিধাটি সম্পর্কে কোনও প্রতিবাদ করেন না, বরং যথেষ্ট শ্লাঘা বোধ করেন। অথচ জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে নবদ্বীপ ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামুলক বিচার করলে এই ঔপনিবেশিক অভিধাটি যে প্রকৃতপক্ষে কতটা অসার, অযৌক্তিক ও অপমানজনক— তা সহজেই বোঝা যায়।

    প্রথমত, প্রাচীনত্বের দিক থেকে নবদ্বীপের থেকে অক্সফোর্ড এগিয়ে ছিল, এমন কোনও পাথুরে প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং নথিপত্র থেকে জানা যায়, দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথম পাদে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্ব (Theology) ও আইন পড়ানো শুরু হয় এবং শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ১১৮৫ ও ১২০৯ সালে যথাক্রমে অক্সফোর্ড ও কেম্ব্রিজের সুনির্দিষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়।[৩] অথচ দ্বাদশ শতাব্দীর বহু আগে থেকেই যে নবদ্বীপে পূর্ণ উদ্যমে জ্ঞানচর্চা শুরু হয়, সেই আলোচনা আমরা আগেই করেছি।

    দ্বিতীয়ত, অক্সফোর্ডের ছাত্রসংখ্যাও কোনও অংশেই নবদ্বীপের সঙ্গে তুলনীয় ছিল না। এ প্রসঙ্গে দীনেশচন্দ্র সেন ১৭৯১ সালের Calcutta Monthly পত্রিকার জানুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত প্রতিবেদন উল্লেখ করে জানান: “এখন (১৭৯১ খৃঃ) এক নবদ্বীপের টোলেই প্রায় ১,১০০ ছাত্র এবং ১৫০ জন অধ্যাপক আছেন। কিন্তু এই টোলগুলির অবস্থা পড়ন্ত দশায়। রাজা রুদ্রের সময়ে অবস্থা ইহাপেক্ষা অনেক ভাল ছিল।”[৪]

    এর প্রায় ১০০ বছর আগে নবদ্বীপের টোলগুলিতে ছাত্রসংখ্যা আরও বেশি ছিল, সে কথা জানিয়ে তিনি লেখেন: “রাজা রুদ্রের সময়ে (১৬৮০ খৃঃ) ছাত্রসংখ্যা ছিল ৪,০০০ এবং অধ্যাপক ছিলেন ছয় শত।”[৫] এর পাশাপাশি রানি অ্যান [শাসনকাল: ১৭০২-১৭১৪] ও রাজা প্রথম জর্জ [শাসনকাল: ১৭১৪-১৭২৭]-এর রাজত্বকালে অক্সফোর্ডে বার্ষিক ছাত্রসংখ্যা ছিল মাত্র ৩০০ জন। ১৭২৬ থেকে ১৮১০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এই সংখ্যা আরও কমে ২০০-এর নীচে নেমে আসে।[৬] এমনকি উনিশ শতকের শুরুর দিকেও অক্সফোর্ডের ১৯টি কলেজে ছাত্র ছিল মাত্র ৫০০ জন। ১৮২০-২৪ সাল নাগাদ তা বেড়ে ১৩০০ জনে দাঁড়ায়। তবে ছাত্রসংখ্যার অনুপাতে অধ্যাপকদের সংখ্যা আদৌ বৃদ্ধি পায়নি। ১৮০০ সালে যেখানে অধ্যাপকের সংখ্যা ছিল সাকুল্যে ১৯ জন, ১৮৫৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় মাত্র ২৫ জনে।[৭] অথচ প্রতিবেদনে উল্লিখিত নবদ্বীপের ‘টোলগুলির পড়ন্ত দশা’-তেও আমরা ১,১০০ ছাত্র ও ১৫০ জন অধ্যাপকের উপস্থিতির কথা জানতে পারি।

    শুধু বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের শিক্ষাব্যবস্থাই নয়, উনিশ শতকে ইংল্যান্ডের স্কুলশিক্ষার চিত্রও আহামরি ছিল না। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের প্রধান দুটি ‘পাবলিক স্কুল’ ইটন ও ওয়েস্টমিনস্টারে ছাত্রসংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। অ্যাডামসনের গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৭৫৪ থেকে ১৭৬৫ সাল পর্যন্ত ইটনের ছাত্রসংখ্যা ছিল ৫০০ জনের সামান্য বেশি। ১৭৬৫-১৭৮৮ সময়কালে সেই সংখ্যা আরও কমে মাত্র ২৩০ জনে নেমে আসে। অন্য দিকে ১৭২৭ সালে ওয়েস্টমিনস্টারে ছাত্রসংখ্যা ছিল ৪৩৪ জন এবং ১৭৬৫ থেকে ওই শতকের শেষে তা কমে ২৫০ থেকে ৩০০ জনে দাঁড়ায়।[৮]

    বিদ্যালয়গুলিতে কেবল ছাত্রস্বল্পতাই ছিল না, পাঠ্যক্রমও ছিল অত্যন্ত অনুন্নত। ১৮৩৪ সালেও ইংল্যান্ডের অধিকাংশ জাতীয় স্কুলে পাঠ্যক্রম মূলত ধর্মীয় শিক্ষা এবং লেখা-পড়া-অঙ্ক (The three ‘R’s) শেখার ওপর সীমাবদ্ধ ছিল। এমনকি অমঙ্গলের আশঙ্কায় অনেক গ্রামীণ স্কুলে লেখাটুকুও শেখানো হত না।[৯] ইটনের মতো নামকরা স্কুলের চিত্র জানিয়ে অ্যাডামসন বলেছেন: “In public schools like Eton, teaching consisted of writing and arithmetic (a number of English and Latin books were studied); while those in the fifth form also learnt ancient Geography, or Algebra.” তবে ‘not till 1851 that Mathematics became a part of the regular school work’।[১০] বিদ্যালয় স্তরে এই ছাত্রস্বল্পতা ও অনুন্নত পাঠ্যক্রমের কারণেই ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শিক্ষাদানের মান সম্পর্কে অ্যাডামসন বলেন: “The fact meant that the English universities were regarded not so much as places of learning, as advanced schools which continued the education begun in the schools below them.”[১১] এর পাশাপাশি নবদ্বীপের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি ফেরালে এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

    তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতামান এবং শিক্ষা সমাপ্ত করার সময়কালের বিষয়েও অক্সফোর্ডের সঙ্গে নবদ্বীপের যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান ছিল। যেখানে ১৫-১৬ বয়সী ছাত্ররা অক্সফোর্ডে ভর্তি হয়ে মাত্র ৪ বছরে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করত, সেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত নবদ্বীপের অধিকাংশ ছাত্রই ছিল প্রৌঢ়বয়স্ক এবং অন্ততপক্ষে ৮ থেকে ১০ বছরের আগে তাদের শিক্ষা সমাপ্ত হত না। এ বিষয়ে পূর্বে উল্লিখিত ক্যালকাটা মান্থলি জানায়: “বহু দূরদেশ হইতে নদীয়াতে ছাত্র-সমাগম হয়, এই আগন্তুক ছাত্রমণ্ডলী অধিকাংশই প্রৌঢ়বয়স্ক। কারণ তাঁহারা বহুকাল অন্তত দর্শনাদি অধ্যয়ন করিয়া নবদ্বীপে ন্যায়দর্শন পাঠ করিবার যোগ্যতা অর্জন করেন। এতদূর পড়িয়া শুনিয়া আসিয়া নবদ্বীপে শিক্ষা সমাপ্ত করিতে তাঁহাদের বিশটি বৎসরের দরকার হয়।”[১২] ১৭৯১-এ প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের প্রায় ৭৫ বছর পরে ১৮৬৭ সালে, কলকাতা সংস্কৃত কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ই. বি. কাওয়েল নবদ্বীপের টোলগুলি পরিদর্শন করে সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেন।

    তাঁর প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়বস্তুর সঙ্গে ক্যালকাটা মান্থলি-র প্রতিবেদনের আশ্চর্য সাযুজ্য পরিলক্ষিত হয়। ওই প্রতিবেদনে কাওয়েল লেখেন: “নবদ্বীপে প্রধানতঃ স্মৃতি ও ন্যায় পড়ানো হইয়া থাকে। এই বিষয়ে নবদ্বীপের খ্যাতি ভারতব্যাপী। বিশেষতঃ ন্যায় পড়িবার জন্য এখানে ভারতবর্ষের সর্ব্বস্থান হইতে ছাত্র আসিয়া থাকে। আমি আমার অবস্থিতিকালে প্রৌঢ়বয়স্ক, এমন কি যাহাদের চুল প্রচুর পরিমাণে পাকিয়া গিয়াছে, এমন সকল পড়ুয়াকে লাহোর, পুনা, তামিল দেশ, এমন কি মিথিলা ও নেপাল প্রভৃতি স্থান হইতেও আসিতে দেখিয়াছি। স্মৃতির টোলে সাধারণতঃ ৮ বৎসর পড়িতে হয়। ন্যায়ের টোলে ১০ বৎসরের নীচে কিছুতেই হয় না। …লাহোর হইতে ত্রিবাঙ্কুর পর্য্যন্ত বহুদেশ হইতে ছাত্রগণ নবদ্বীপে আসিয়া থাকে। নবদ্বীপের উপাধি পাইলে ভারতীয় সমস্ত বিদ্যাকেন্দ্রে সেই পণ্ডিত সম্মানিত হন। যদিও বৎসরের কয়েকমাস টোলগুলি বন্ধ থাকে, বাকী কয়েক মাস ছাত্রগণ প্রাণান্ত পরিশ্রম করিয়া এই ক্ষতি পূরণ করিয়া থাকেন।”[১৩]

    যেখানে অষ্টাদশ শতকের নবদ্বীপে ‘প্রৌঢ়বয়স্ক ছাত্রমণ্ডলী’-র শিক্ষা সমাপ্ত করতে ‘বিশটি বৎসরের দরকার হয়’ কিংবা উনিশ শতকে নবদ্বীপের টোলগুলির ‘পড়ন্ত’ দশাতেও যেখানে পড়ুয়াদের একটি বিষয়ে অন্ততপক্ষে ৮ থেকে ১০ বছর পড়তে হয়; সেখানে অষ্টাদশ শতকের ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পড়ুয়া কী অনায়াসে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করত, তার বিবরণ দিয়ে টমাস শেরিডান জানিয়েছেন: “When a boy can read English with tolerable fluency, which is generally about the age of seven or eight years, he is put to school to learn Latin and Greek; where seven years are employed in acquiring but a moderate skill in those languages. At the age of fifteen or thereabouts, he is removed to one of the universities, where he passes four years more in procuring a more competent knowledge of Greek and Latin, in learning the rudiments of logick, natural philosophy, astronomy, metaphysics, and the heathen morality. At the age of nineteen or twenty a degree in the arts is taken, and here ends the education of a gentleman.”[১৪] এই প্রসঙ্গে ডবসের গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি যে, উনবিংশ শতাব্দীর ‘আলোকিত’ ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ইটন স্কুলে অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে পড়ুয়াদের ছাত্রজীবনের গড় দৈর্ঘ্য ১৮৩৫-এ এক বছর থেকে বেড়ে ১৮৫১ সালে মাত্র দু’বছর হয়।[১৫]

    সর্বোপরি, অষ্টাদশ শতকের প্রথমভাগ পর্যন্ত জ্ঞানচর্চার পীঠস্থান নবদ্বীপ কোনও আমলেই অক্সফোর্ডের মতো কেন্দ্রীভূত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিকশিত হয়নি। বরং দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করে উচ্চশিক্ষার চর্চাকেন্দ্র হিসেবে নবদ্বীপ ছিল বিকেন্দ্রীভূত এবং সম্পূর্ণ অবৈতনিক। নবদ্বীপের বিখ্যাত পণ্ডিতবর্গ শিক্ষার্থীদের কেবল বিনা বেতনেই পড়াতেন না, তাদের খাওয়া-পরা ও বাসস্থানেরও বন্দোবস্ত করতেন। এ বিষয়ে অধ্যাপক কাওয়েল লেখেন: “পূর্ব্বকালে গ্রীস দেশে যেরূপ লেখাপড়ার উচ্চাঙ্গ অনুশীলন হইত এবং যাহার বিবরণ আমরা মাঝে মাঝে প্লেটোর ‘বাদানুবাদে’ (Controversies) পাই, আশ্চর্যের বিষয় নবদ্বীপে আমরা সেই প্রাচীন সময়ের একটা ধারা যেন সাক্ষাৎ সম্বন্ধে দেখিতে পাইলাম। বিদ্যাদান করিয়া অর্থগ্রহণ করা ইঁহারা পাপ মনে করেন; পণ্ডিতেরা শুধু বিনাবেতনে ছাত্রদিগকে পড়াইয়া ক্ষান্ত থাকেন না, পরন্তু তাহাদের খাওয়াপরা ও বাসস্থান যোগাইয়া থাকেন। ইঁহারা বড়লোকদের সামাজিক ধর্মকার্য্যে বিদায় এবং নানারূপ ব্যাপারে দক্ষিণা লাভ করিয়া এই সমস্ত খরচ নির্ব্বাহ করেন।”[১৬] অথচ ১৮৫০ সাল নাগাদ অক্সফোর্ডে চার বছর শিক্ষাগ্রহণের শেষে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের জন্য একজন পড়ুয়াকে প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ পাউন্ড খরচ করতে হত।[১৭]

    এই আলোচনার শেষে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা চলে, জ্ঞানচর্চার প্রাচীনত্ব বা টোলগুলিতে ছাত্র ও অধ্যাপক সংখ্যার প্রাচুর্য অথবা ভর্তি হওয়ার যোগ্যতামান ও শিক্ষা সমাপ্ত করার সময়কাল কিংবা টোলগুলির গঠনগত ও পরিচালনগত পদ্ধতি— কোনও দিক থেকেই মধ্যযুগের নবদ্বীপের সঙ্গে অক্সফোর্ডের সামান্যতম সাদৃশ্যও চোখে পড়ে না। বরং যে সময়কালে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে নবদ্বীপ দক্ষতার শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করে, সেই একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অক্সফোর্ড অতি সাধারণ মানের বিদ্যাচর্চার স্থান হিসেবে পরিগণিত হতে বাধ্য। একই সঙ্গে মনে রাখা জরুরি, উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে অক্সফোর্ড যখন ক্রমেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পড়ুয়াদের কাছে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যস্থল হয়ে ওঠে, তখন নবদ্বীপের জ্ঞানচর্চার গরিমা প্রায় অস্তমিত। তাই সব দিক বিবেচনা করে এ কথা বলাই সঙ্গত, অক্সফোর্ডকে যেমন ‘ব্রিটেনের নবদ্বীপ’ বলার যৌক্তিকতা নেই; ঠিক তেমনই নবদ্বীপকেও ‘বাংলার অক্সফোর্ড’ আখ্যায় আখ্যায়িত করা শুধু অনৈতিহাসিকই নয়, অসমীচীনও বটে।

    পাদটীকা

    1. ‘নবদ্বীপ বিদ্যাপীঠের ইতিবৃত্ত’; কান্তিচন্দ্র রাঢ়ী, নবদ্বীপ মহিমা, যজ্ঞেশ্বর চৌধুরী (সম্পাদিত), পরিবর্ধিত সংস্করণ, নবদ্বীপ, ২০০৪, পৃ. ৩১৬
    2. দীনেশচন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, কলকাতা, ১৩৪১, পৃ. ৩৬০
    3. J. W. Adamson, A Short History of Education, Cambridge, 1930, pp. 35-36
    4. দীনেশচন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, পৃ. ৩৪৬
    5. তদেব
    6. J. W. Adamson, A Short History of Education, p. 219
    7. Dharampal, The Beautiful Tree: Indigenous Indian Education in the Eighteenth Century, Goa, 2000, p. 12
    8. J. W. Adamson, A Short History of Education, p. 221
    9. A. E. Dobbs, Education and Social Movements 1700-1850, London, 1919, p.158
    10. J. W. Adamson: A Short History of Education, p. 226
    11. তদেব
    12. দীনেশচন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, পৃ. ৩৪৬
    13. তদেব, পৃ. ৩৪৮
    14. Thomas Sheridan, British Education: Or, The Source of the Disorders of Great Britain, London, 1769, p.17
    15. A. E. Dobbs, Education and Social Movements 1700-1850, pp. 157-58
    16. দীনেশচন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, পৃ. ৩৪৭
    17. Dharampal, The Beautiful Tree: Indigenous Indian Education in the Eighteenth Century, p. 13