সপ্তাহের সেরা

    আখ্যাত রচনা

    অনুবাদআরব্য রজনীর তৃতীয় রজনী

    আরব্য রজনীর তৃতীয় রজনী

    আরব্য রজনীর তৃতীয় রজনী

    তৃতীয় রজনীতে দুনিয়াজাদ তার বোনকে গল্পটি শেষ করতে বলল। ‘সানন্দে,’ বলে শুরু করল শাহরাজাদ: ‘হে সৌভাগ্যবান রাজা, আমি শুনেছি যে তৃতীয় বৃদ্ধ ইফ্রিতকে অন্য দু’জনের চেয়ে আরও চমকপ্রদ গল্প বলেছিলেন এবং তার বিস্ময় ও আনন্দে ইফ্রিত তাকে রক্তের ঋণের অবশিষ্ট অংশ প্রদান করে এবং বণিক মুক্তভাবে চলে যাবার অনুমতি প্রদান করে। অতঃপর বণিক উঠে দাঁড়ালেন এবং বৃদ্ধদের ধন্যবাদ জানালেন যারা তাকে বেঁচে ফেরার জন্য অভিনন্দন জানালেন। তারপর তারা সকলে নিজ নিজ বাড়িতে চলে গেলেন। এটা অবশ্য জেলের গল্পের চেয়ে বেশি চমকপ্রদ নয়।’

    ধীবরের গল্প

    রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সেটা আবার কী রকম?’

    তখন শাহরাজাদ আবার বলতে শুরু করলেন—

    হে পয়মন্ত রাজা, আমি শুনেছি যে, একদা স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ এক ধীবর ছিলেন, তিনি ছিলেন বৃদ্ধ ও দরিদ্র। তিনি নিয়ম করে প্রতিদিন চারবার জাল ফেলতেন। একদিন দুপুরে তিনি সমুদ্র তীরে গেলেন, খারাটি নামিয়ে তার উপর জামা খুলে রেখে সমুদ্রে নেমে জাল ফেললেন। জালটি ভাল করে ডুবে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন, এরপর দড়ি ধরে জালটি তুলে আনার চেষ্টা করলেন। তিনি ভারি বোধ করলেন এবং টেনে তুলতে ব্যর্থ হলেন। অতঃপর একটি খুঁটিতে দড়ির প্রান্ত বেঁধে নিজের জামা-কাপড় খুলে রাখেন। এরপর জলে নেমে পড়লেন। জালের চার পাশে ডুব দিয়ে জালটিকে তুলে আনার চেষ্টা করতে লাগলেন। জালটিকে পুরোপুরি তুলে আনা পর্যন্ত তিনি অনবরত চেষ্টা করে গেলেন। তিনি আনন্দিত মনে উপরে উঠে এসে নিজের জামা-কাপড় পড়লেন। এরপর জালের কাছে এসে দেখেন যে শুধু একটি মৃত গাধা জালে ফেঁসে আছে, এটি জালটিকে ছিড়ে ফেলেছে। এতে জেলে দুঃখিত হলেন, বললেন, ‘লা হাওলা ওলা ক়ুয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল ‘আলী ঈল আজীম।’ তারপর বললেন, ‘আল্লাহ আমাকে খাদ্যের পরিবর্তে এক অদ্ভুত জিনিস দিলেন!’ তারপর গাইতে লাগলেন—

    রাতের আঁধারে ডুব দিয়ে বিপদে পড় তুমি,

    থাম! প্রচেষ্টা প্রতিদিনের রিযিক জিততে পারে না।

    রিযিকের জন্য উঠে পড়ে ধীবর;

    আছে সমুদ্র, তারায় খচিত আকাশ।

    সে ডুবে যায়, ঢেউয়ের কবলে পড়ে

    তরঙ্গায়িত জালের দিকে তার চক্ষু স্থির।

    রাতের কাজে খুশি হয়ে সে বাড়ি ফিরে যায়,

    তার কাঁটাওয়ালা বড়শিতে একটি মাছ ধরা পড়েছে।

    রাত অতিবাহিত করে ধরা মাছটি একজন কিনে নিয়েছে,

    ঠাণ্ডা থেকে বেরিয়ে তার আরাম বোধ হচ্ছে,

    আলহামদুলিল্লাহ, যিনি দেন এবং বঞ্চিত করেন;

    একজন মানুষ মাছটি খাবে; অন্য মানুষ ধরে আনবে।

    ‘ইনশাআল্লাহু তায়ালা’ বলে নিজেকে তিনি উৎসাহিত করলেন। আবৃত্তি করলেন—

    যখন কষ্টে পতিত হও, নিজেকে ধৈর্যের

    মহৎ পোশাকে আবৃত কর; এটাই সবচেয়ে দৃঢ়।

    আল্লাহর বান্দাদের কাছে অনুযোগ করো না,

    যার কাছে প্রার্থনা করবে, তার প্রতি দয়াময়ের দয় নেই।

    তিনি গাধাটিকে জাল থেকে মুক্ত করলেন, এরপর ভাল করে মুছড়িয়ে জালটি ধুয়ে নিলেন। পুনরায় গাধাটিকে সমুদ্রের পানিতে ফেলে দিলেন। ‘বিসমিল্লাহ,’ বলে পুনরায় জাল ফেললেন। জালটি স্থির না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। জালটিকে আগের চেয়ে ভারী মনে হল এবং এটিকে তুলে আনা আরও বেশি কষ্টকর হল। ভাবলেন, এবার নিশ্চয় মাছে পূর্ণ হবে। তিনি জালের দড়ি খুঁটিতে বাঁধলেন। নিজের জামাকাপড় খুলে ফেললেন এবং এটিকে মুক্ত করার জন্য পানিতে ডুব দিলেন। তিনি জালটি টেনে তীরে নিয়ে এলেন, দেখলেন, বালু ও কাদায় পরিপূর্ণ একটি কলসি উঠে এসেছে। এই দৃশ্য দেখে ব্যথিত হয়ে তিনি পাঠ করলেন—

    সময়ের মহাঝঞ্ঝাট, আমাকে রেহাই দাও!

    থাম, যদিও তোমার থাকার মত যথেষ্ট নেই।

    আমি আমার রিযিকের খোঁজে বের হই,

    অথচ আমি যা পাই তা মোটেই রিযিক নয়।

    কত বোকা স্বর্গে চলে গেছে,

    কত জ্ঞানী শায়িত আছে মাটির গহীনে।

    ধীবর কলসিটি দূরে ফেলে দিলেন, জাল ঝাড়লেন, পরিষ্কার করলেন এবং তৃতীয় বারের মত সমুদ্রের কাছে ফিরে এলেন। বললেন, আস্তাগফিরুল্লাহু তায়ালা। তিনি জালটি নিক্ষেপ করলেন, স্থির হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন, এরপর টেনে তুললেন। এবার তিনি যা পেলেন তা হল, পাত্র, বোতল ও হাড়ের টুকরো। তিনি ক্রোধান্বিত হলেন, তার অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। তিনি গুনগুনিয়ে গাইলেন—

    তোমার প্রাত্যহিক রিযিকের উপর তোমার কোন ক্ষমতা নেই;

    জ্ঞাতসারে নয়, বার্তা দিয়েও নয়, তোমার যা তা চলে আসবে।

    ভাগ্য এবং রিযিক বিভক্ত;

    একটি ভূমি উর্বর এবং অন্যটি খরায় ভুগছে।

    সময় কৃতবিদ্য মানুষকেও নিচে নামিয়ে দেয়,

    তখন ভাগ্য অযোগ্যদেরও উপরে তুলে দেয়।

    জন্মাও, মরো, আমাকে দেখ জীবনের বর্বরতার জন্য;

    বাজগুলি নিচে নেমে আসে আর হাঁসগুলো উপরে উঠে যায়।

    দারিদ্রের মধ্যে একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ পেয়ে গেলেও

    অবাক হবার কিছু নেই, যখন নিকৃষ্টতর প্রভূত্ব করে।

    একটি পাখি পৃথিবীকে পৃর্ব হতে পশ্চিমে প্রদক্ষিণ করে

    আরেক জন কোন রকম চেষ্টা ছাড়াই খেতে পায়।

    তিনি আকাশের দিকে তাঁকান, বলেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি তো জান, আমি প্রতিদিন চার বার মাত্র আমার জাল ফেলি। আমি তিন বার জাল ফেলেছি এবং কিছুই পাইনি, এবার আমাকে জীবনধারণের মত কিছু দান করো।’ তিনি ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম,’ বলে জাল ফেললেন। অপেক্ষা করলেন জালটি পুরোপুরি ডুবে যাওয়ার জন্য, এরপর তিনি সেটিকে তুলে আনার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বুঝতে পারলেন জালটি নিচে গুপ্ত কোন কিছুতে আটকে গেছে। তিনি বললেন, ‘লা হাওলা ওয়া লা ক়ুয়াতা ইল্লাবিল্লাহিল আলীইল আযীম।’ অতঃপর বলতে থাকেন—

    কত নগণ্য এই পৃথিবীর মহানুভবতা

    যে আমাদের কষ্ট ও দুর্দশায় ছেড়ে দেয়!

    প্রভাতে সব কিছুই হয়ত ঠিকঠাক থাকবে

    সাঁঝেই হয়ত পান করাবে ধ্বংসের গরল।

    তবুও এটি যখন জানতে চায়, ‘নিশ্চিত জীবন

    কে চায়?’ তখন মানুষ বলবে, ‘এই যে আমি!’

    ধীবর আবারও জামাকাপড় খুলে জলে নেমে গেলেন, জালটিকে তীরে তুলে আনার জন্য তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। যখন তিনি জালটি খুললেন, একটি পিতলের ঘড়া দেখতে পেলেন। এটির মুখ সীসায় ঢালাই করা ছিল। তাতে লেখা রয়েছে, ‘সাইয়্যেদানা সুলাইমান ইবনে দাউদ আলাইহুমাস সালাম।’ ধীবর আনন্দিত হয়ে উঠলেন, মনে মনে বললেন, পিতলের বাজারে এটিকে বিক্রি করলে দশ সোনার দিনার পাওয়া যাবে। তিনি ঘড়াটি ভাল করে ঝাঁকালেন, কিন্তু সীসার গালা ছিল অনেক মজবুত। তিনি মনে মনে বললেন, ‘আমি ভাবছি এর মধ্যে কী আছে? আমি এটিকে বিক্রি করার আগে একবার খুলে দেখব।’

    তিনি একটি ছুরি বের করেন, তারপর ধীরে ধীরে ঘড়ার মুখ থেকে খুঁচিয়ে খুঁচিয় সীসার ঢালাই খুলে ফেললেন। সেটিকে মাটির উপর রেখে এটির ভিতর কী আছে তার বের করার জন্য ভালভাবে ঝাঁকাতে লাগলেন। তিনি আশ্চর্য হলেন, প্রথমে কিছুই বের হল না। কিন্তু কিছুক্ষণপর ধোঁয়ার কুণ্ডলী বের হয়ে মাটির উপর থেকে আকাশ পর্যন্ত চেয়ে গেল। সম্পূর্ণ বের হওয়ার পর এটি জমাট বেঁধে গাঢ় হল, তখন একটি কম্পন শুরু হল। ধীরে ধীরে একটি ইফ্রিত হয়ে গেল যার মাথা মেঘের মধ্যে আর পা মাটিতে। তার মাথা গুম্বজের মত, হাত দু’টি লম্বা গাঁইতির মত, আর পা দু’টি যেন জাহাজের মাস্তুল। তার মুখগহ্বর গুহার মত, দাঁতগুলো যেন একেকটি পাথর। তার নাসারন্ধ্র দু’টি কুঁজার মত আর চক্ষু দুটি প্রদীপের মত। সে ছিল তমসাচ্ছন্ন বড় নৌকার মত।

    ইফ্রিতকে দেখে ধীবর কাঁপতে লাগলেন, তার দাঁত ঠকঠক করতে লাগল, তার গলা শুকিয়ে গেল এবং তিনি কোথায় যাচ্ছেন কিছুই দেখতে পেলেন না। তাকে দেখে ইফ্রিত বলে উঠল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু সুলাইমান নবীয়ুল্লাহ। হে আল্লাহর নবী, আমাকে হত্যা করবেন না। আমি আর কখনও কথায় ও কাজে আপনাকে অমান্য করব না।’

    ‘ইফ্রিত,’ ধীবর বললেন, ‘তুমি নবী সুলাইমান আলাইহিস সালামের কথা বলছ কিন্তু সোলাইমান তো মারা গেছে আঠার শত বছর আগে, আমরা বর্তমানে পৃথিবীর শেষ যুগে বাস করছি। তোমার ঘটনাটি কী, আর তুমি এই পিতলের ঘড়ার ভিতর এলে কী করে?’

    জবাবে ইফ্রিত বলল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। জেলে, আমার কাছে তোমার জন্য একটা সুখবর আছে।’

    ‘সেটা কী?’ ধীবর জানতে চাইলেন, ইফ্রিত বলল, ‘এখন আমি তোমাকে যন্ত্রনাদায়ক মৃত্যু প্রদান করব।’

    ‘এই সুসংবাদের জন্য,’ ধীবর চিৎকার করে উঠেন, ‘তুমি আল্লাহর রহমতের ছায়া থেকে বঞ্চিত হবে, অভিশপ্ত শয়তান! তুমি আমাকে হত্যা করবে কী কারণে, আমি কি করেছি যে আমার এমন পরিণতি হবে? আমিই তোমাকে সাগরের তলদেশ থেকে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে এসেছি।’

    তবু ইফ্রিত বলল, ‘তুমি কেমন মৃত্যু চাও, কিভাবে মরতে চাও তুমিই বল।’

    ‘আমার অপরাধ কী?’ ধীবর জানতে চাইলেন, ‘তুমি আমাকে কেন হত্যা করতে চাও?’

    ইফ্রিত বলল, ‘আমার কাহিনী শোন,’ ধীবর বললেন, ‘বল, তবে সংক্ষেপে বলবে, আমি এখন শেষ মুহূর্তে আছি।’

    ইফ্রিত তাকে বলল, ‘জেনে রাখ, আমি ছিলাম সাখর জীনদের অন্তর্ভুক্ত দুর্বৃত্ত এক জীন, আমি সুলাইমান ইবনে দাউদ আলাইহুমাস সালামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলাম। সুলাইমান তার উজীর আসাফ ইবনে বারখিয়াকে পাঠালেন আমাকে গ্রেফতার করে আনার জন্য। তিনি আমাকে জীবিত এবং অপমানজনক পরিস্থিতিতে বন্দী করে সোলাইমান আলাইহিস সালামের হস্তে সোপর্দ করলেন। সোলাইমান আমাকে দেখে রাগান্বিত হয়ে বললেন, “আউযুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বনির রাযীম।” তখন তিনি আমাকে ঈমান গ্রহণ করতে ও তার অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত হবার আহ্বান জানালেন।

    আমি তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলাম। তখন তাঁর আদেশে একটি ঘড়া নিয়ে আসা হল, তিনি আমাকে সে ঘড়ায় বন্দী করে তাতে সীসা ঢালাই করে দিলেন। তাতে তিনি ইসমে আযম খোদাই করে দিয়েছিলেন। অতঃপর তার আদেশে জীনেরা আমাকে বহন করে এনে মধ্য সমুদ্রে নিক্ষেপ করল।’

    ‘আমি শতাব্দিকাল সেখানে ছিলাম, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম যে, যে আমাকে মুক্ত করবে আমি তাকে চিরকাল বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট সম্পদ দান করব, কিন্তু সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও কেউ আমাকে উদ্ধার করতে আসেনি। পরবর্তী শতাব্দীতেও আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, যে আমাকে উদ্ধার করবে আমি তার জন্য পৃথিবীর সমস্ত ধনভাণ্ডার খুলে দিবো, কিন্তু কেউ আমাকে উদ্ধার করল না। চার শো বছর পরে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম যে, আমি উদ্ধারকারীর তিনটি ইচ্ছে পূর্ণ করব, তবুও আমাকে কেউ উদ্ধার করেনি। আমি প্রচণ্ড রাগান্বিত হলাম এবং প্রতিজ্ঞা করলাম, যে আমাকে উদ্ধার করবে আমি তাকে হত্যা করব, তাকে একটা সুযোগ দিবো যে সে কিভাবে মরতে চায়। তুমি আমাকে উদ্ধার করেছ, তাই তুমি কিভাবে মরতে চাও আমাকে তা বল।’

    ধীবর যখন এইসব কথা শুনলেন, তিনি বিস্ময়ে আর্তনাদ করে উঠলেন, দুর্ভাগ্যবশত তিনি ইফ্রিতকে এখন উদ্ধার করেছেন। তিনি বলতে লাগলেন, ‘আমাকে ক্ষমা করে দাও, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিবেন। আমাকে হত্যা করো না, নয়ত আল্লাহ তোমার চেয়ে শক্তিমান এমন একজনকে পাঠাবেন যে তোমাকে হত্যা করবে।’

    ইফ্রিত জোর দিয়ে বলল, ‘আমি নিশ্চয় তোমাকে হত্যা করব, তুমি কিভাবে মরতে চাও তা বেছে নাও।’

    বিষয়টি উপেক্ষা করে ধীবর ইফ্রিতকে তার উদ্ধারের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাতে আহ্বান জানালেন।

    ‘তুমি আমাকে উদ্ধার করেছ বলেই আমি তোমাকে হত্যা করব,’ ইফ্রিত পুনরায় বলল।

    তখন ধীবর বললেন, ‘ইফ্রিত সর্দার, আমি তোমার ভাল করেছি, আর তুমি আমার অনিষ্ট করতে চাও। প্রবাদের কথাগুলোই ঠিক, যাতে বলা হয়েছিল—

    আমরা করেছি হিত, তারা করেছে তার বিপরীত

    আল্লাহর কসম, এই কাজ কত না নির্লজ্জতার;

    যে নয় হিতের দাবীদার, করো না তার উপকার,

    করো না তার মত যে করেছিল হায়েনা উদ্ধার।

    ‘কথা বাড়িও না, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও,’ প্রবাদ শুনে বলল ইফ্রিত।

    ধীবর মনে মনে ভাবলেন, ‘সে হচ্ছে জীন, আমি হলাম মানুষ। আল্লাহ আমাকে সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করার বুদ্ধি বিবেচনা দিয়েছেন, তাকে ধ্বংস করার একটা উপায় আমি বের করতে পারি যেখানে সে কেবল বিপদজনক চালাকিই করতে পারে।’

    ধীবর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি আমাকে সত্যিই হত্যা করবে?’ ইফ্রিত নিশ্চিত করার পর তিনি বললেন, ‘আমি তোমাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করছি, রাজা সুলাইমানের সীলে লেখা ইসমে আযমের কসম, আমি যা জিজ্ঞেস করব তুমি আমাকে সত্য জবাব দিবে।’

    ইসমে আযমের কথায় কেঁপে উঠে ইফ্রিত, সে বলে, ‘অবশ্যই সত্য জবাব দিব।’ অতঃপর বিরক্ত হয়ে এগিয়ে এসে বলল, ‘সংক্ষেপে তোমার প্রশ্নটি জিজ্ঞাস করো।’

    ধীবরও এগিয়ে গেলেন, ‘তুমি বলছ যে তুমি এই ঘড়াতে ছিলে, কিন্তু তাতে তো তোমার হাত বা পা রাখার জায়গাও নেই, সারা দেহ তো দূরের কথা।’

    ‘তুমি কি বিশ্বাস করো না যে আমি এই ঘড়াতে ছিলাম?’ ইফ্রিত জিজ্ঞাসা করল।

    ধীরব বললেন, ‘স্বচক্ষে না দেখে আমি কখনোই বিশ্বাস করব না।’

    ভোর হয়েছে, শাহরাজাদ তার গল্প বলা স্থগিত করলেন।

    তাহের আলমাহদী
    তাহের আলমাহদী
    জন্ম কুমিল্লায়। পড়াশোনা করেছেন লাকসাম নওয়াব ফয়েজুন্নেসা সরকারি কলেজ ও নোয়াখালী সরকারি কলেজে। রিযিকের সন্ধানে দেড় যুগের বেশি সময় আছেন সাউদী আরবে। সাহিত্যের চর্চা ছাত্রজীবন থেকে হলেও কোন লেখাই প্রকাশিত হয়নি। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগের বশেই গড়ে তুলেছে সাহিত্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠান এডুলিচার। এছাড়া বিনামূল্য গ্রন্থ সরবরাহের জন্য আছে এডুলিচার অনলাইন লাইব্রেরি এবং সম্পাদনা করছেন অনলাইন সাহিত্য পত্র ‘জেগে আছি’।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here
    Captcha verification failed!
    CAPTCHA user score failed. Please contact us!

    আরব্য রজনীর চতুর্থ রজনী

    চতুর্থ রজনী, দুনিয়াজাদ শাহরাজাদকে তার গল্পটি শেষ করতে অনুরোধ জানাল, যদি সে ঘুমিয়ে না পড়ে। তখন সে বলতে শুরু করল— আমি শুনেছি, হে মহান রাজা,...

    আরব্য রজনীর দ্বিতীয় রজনী

    যখন দ্বিতীয় রাত হল, দুনিয়াজাদ শাহরাজাদকে বললেন, ‘আপু, আমাদের জন্য তোমার বণিক ও ইফ্রিতের গল্প শেষ কর।’ ‘সানন্দে,’ জবাব দিল শাহরাজাদ, ‘যদি রাজা অনুমতি প্রদান...

    আরব্য রজনীর প্রথম রজনী

    বণিক ও ইফরিতের গল্প শাহরাজাদ বলেছিলেন: আমি শুনেছি, হে সুখী রাজা, এক ছিলেন ধনী বণিক, দেশজুড়ে ছিল তার বিভিন্ন ব্যবসায়, একদিন তিনি অশ্বারোহণে কোন একটি...

    আরব্য রজনী : গাধা, বলদ ও বণিকের গল্প

    গাধা, বলদ ও বণিকের গল্প যখন তার পিতা এই কথা শুনলেন, তিনি তাকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার এবং রাজার মধ্যে যা ঘটেছিল তার সবই...

    আরব্য রজনী : রাজা শাহরিয়ার ও তার ভাইয়ের গল্প

    রাজা শাহরিয়ার ও তার ভাইয়ের গল্প প্রাচীন মানুষদের ইতিহাসে একটি কাহিনী প্রচলিত আছে যে, প্রাচীনকালে ভারত ও চৈনিক দ্বীপপুঞ্জে সাসানীয় সাম্রাজ্যের একজন রাজা ছিলেন। তার...

    লেখক অমনিবাস

    বানান ও উচ্চারণ, কে কার অনুগামী হবে?

    উচ্চারণ অভিধানগুলোতে ব্যঞ্জনবর্ণের লুপ্ত অ-কে ও দিয়ে চিহ্নিত করা হয়, বানান থেকে হসন্ত বিলুপ্ত করার প্রয়াসেই এই নূতন সমস্যার সৃষ্টি। সকলেই জানে ব্যঞ্জন বর্ণের মধ্যে...

    লিপিশক্তি কী ও কেন প্রয়োজন?

    আমাদের সৌভাগ্য যে, বাংলা ভাষার নিজস্ব একটি লিপি আছে। এই লিপি দিয়ে আমরা আমাদের প্রতিটি ধ্বনিকে লিখতে পারি। কিন্তু, শক্তিমান লিপিগুলোর মধ্যে বাংলার স্থান...