সপ্তাহের সেরা

    আখ্যাত রচনা

    তাভেরনিয়ের ভ্রমণ : পর্ব এক

    মূল : The Six Voyages of John Baptista Tavernier (1678)

    একজন মানুষ একই সময়ে ও একই উপায়ে এশিয়া ভ্রমণ করতে পারে না, যেমনটি তারা ইউরোপ ভ্রমণ করে। শহর থেকে শহরে সাপ্তাহিক কোন গাড়ি নেই, যাত্রীবাহীও না, মালবাহীও না। দেশগুলোর ভূপ্রকৃতিও বিভিন্ন রকমের। এশিয়ায় অখ্যাত ও জনমানবশূন্য এমন অনেক অঞ্চল দেখতে পাবেন যার আবহাওয়া ও মাটি অনেক খারাপ অথবা সেখানকার অধিবাসীরা অকর্মণ্য, তারা পরিশ্রমের চেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত জীবনকেই বেশি পছন্দ করে। পাড়ি দিতে হবে বিস্তৃর্ণ ও বিপজ্জনক মরুভূমি। কোথাও পানি খুঁজে পাবেন না। ডাকাতি আরবদের নৈমত্তিক ব্যাপার। পর্যটকদের বিনোদনের জন্য নির্দিষ্ট কোন মঞ্চ বা সরাইখানা নেই। বিশেষ করে তুরস্কে, আপনার সঙ্গে আনা তাঁবু গুলোই হবে উত্তম সরাইখানা। আপনার চাকরেরাই আপনাকে আতিথ্য করবে। ভাল কোন শহর থেকে কিনে আনা খাবারগুলিই পরিবেশন করবে। খোলা মাঠে অথবা যে শহরে সরাইখানা নেই সেখানে আপনার তাঁবুগুলি স্থাপন করুন। সূর্য খুব বেশি গরম না হলে অথবা বৃষ্টি না নামলে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া উপভোগ করতে পারবেন। তুর্কির চেয়ে পারস্যে পান্থনিবাস ও সরাইখানা বেশি পাওয়া যায়। সেখানে এমন কিছু লোক আছে যারা আপনাকে উত্তম সেবা প্রদান করবে। প্রথমে এলে সবচেয়ে ভাল সেবা পাওয়া যায়। তুর্কি দস্যু ভরা, তারা অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত থাকে এবং বণিকদের সড়কের উপরেই আক্রমণ করে। যথেষ্ট নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকলে দস্যুরা সব লুটে নিবে, বরং অনেক সময় বণিকদের হত্যা করা হয়। পারস্যে এই দুরাচার রোধ করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এটি পর্যটকদের জন্য অনেক সুবিধাজনক। এই ধরণের বিপদ ও অসুবিধাগুলি এড়াতে আপনি পারস্য বা ভারতবর্ষের উদ্দেশে রওয়ানা হওয়া কাফেলাগুলোর সাথে থাকতে বাধ্য। কাফেলাগুলো কখন কোথা থেকে বের হবে তার কোন সুনির্দিষ্টি নেই।

    এই কাফেলাগুলো কনস্টান্টিনোপল, স্মির্না এবং আলেপ্পো থেকে যাত্রা করে। পারস্যে যাবার মনস্থ করলে এই শহরগুলোর যেকোন একটি থেকে পর্যটককে যাত্রা করতে হবে, কোন কাফেলার সাথে অথবা একাকী কোন পথপ্রদর্শকের সঙ্গে গিয়ে নিজেকে বিপদগ্রস্ত করবে। একবার আমিও এমন বিপদে পড়েছিলাম।

    কনস্টান্টিনোপল দিয়েই শুরু করছি। এখান থেকে আপনি স্থলপথ বা সমুদ্রপথে যেতে পারবেন। স্থলপথে ও সমুদ্রপথে যেতেও দুটি উপায় রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম স্থলপথে আমি মসিঁয়ে চ্যাপস ও মসিঁয়ে সেন্ট লিবাউকে সাথে নিয়েছিলাম। লক্ষ্য করলাম, ভিয়েনা প্যারিস ও কনস্টান্টিনোপলের মধ্যবর্তী অর্ধেক পথ। দ্বিতীয় পথে গমানগমন কম, অথচ কম অসুবিধাজনক ও কম বিপজ্জনক। সম্রাটের পাসপোর্টেরও দরকার হয় না। তিনি তা খুব সহজে প্রদানও করেন না। এই পথে তিউনিসীয় বা আর্জিয়ারের জলদস্যুদের ভয় নেই। লিগর্নের মার্সেইল থেকে যাত্রা করার মত। এই পথে যেতে মনস্থ করলে আপনাকে ভেনিস যেতে হবে। ভেনিস থেকে অ্যাঙ্কোনা, যেখান থেকে প্রতি সপ্তাহে ছোট ছোট অনেকগুলো জাহাজ রাগুসায় যায়। রাগুসা থেকে সৈকতের কাছাকাছি চলে আলবেনীয় সমুদ্রবন্দর ডুরাজুতে যাবেন। এখান থেকে অবশিষ্ট পথ আপনাকে স্থলপথেই যেতে হবে। ডুরাজু থেকে আলবানোপলিস তিন দিনের যাত্রা। সেখান থেকে যাবেন মনেস্টিয়ার, দুরত্ব আগের মতই। মনেস্টিয়ার থেকে সোফিয়া এবং ফিলিপ্পোপোলিস হয়ে বামে অথবা ইনগুইচার হয়ে ডানে চলুন। মনেস্টিয়ার থেকে তিন দিনের যাত্রা এবং আদ্রিয়ানোপল থেকে দশ দিনের যাত্রা। এখান থেকে পাঁচ দিন চলে সেলিভ্রেয়া হয়ে কনস্টান্টিনোপল পৌঁছে যাবেন।

    শেষের পথটি আংশিক সমুদ্র ও আংশিক স্থল। স্থলেও দুটি পথ রয়েছে, একটি ইতালির উচ্চভূমি হয়ে, অন্যটি নিম্নভূমি হয়ে। যা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি প্রাচীন দুটি সমুদ্র দ্বারা পরিবেষ্টিত। আপনি ভেনিসে যাত্রা করতে পারেন, বলা যায় এটি জলদস্যু মুক্ত। দ্বীপপুঞ্জে প্রবেশ করতে হলে আপনাকে ইউরোপের সর্বদক্ষিণের মাতাপান অন্তরীপের দ্বিগুণ পথ চলতে হবে। অন্য পথটি হলো, মারসেলিস বা লিগর্ন, যেখান থেকে অনেকগুলো জাহাজ পূর্ব দিকে যাত্রা করে। সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হল ইংরেজ বা হল্যান্ডের নৌবহরগুলির সাথে যাওয়া, যেগুলি সাধারণত বসন্ত বা শরতকালে লিগর্নে পৌঁছায় এবং মোরিয়ার বিপরীতে বেশ কয়েকটি অংশে যাতায়াত করে। বায়ু প্রবাহের নিরীখে নৌবহরগুলি এলবা দ্বীপ ও ইতালির মধ্যবর্তীতে এবং মেসিনা টাওয়ারের নিকটে, কখনও কখনও সিসিলি ও মাল্টার সন্নিকটে সারদিগ্নায় পাল তুলে দেয়। এভাবে আপনাকে ক্যান্ডি টাওয়ারের সন্নিকটে আসতে হবে। এখান থেকে আপনি কনস্টান্টিনোপল, স্মির্না অথবা আলেজান্দ্রিয়ায় যাতায়াত করতে পারবেন। যেখান থেকে আলেপ্পো মাত্র তিন দিনের যাত্রা। পারস্য যাওয়ার মনস্থ করলে এই তিনটি শহরের যেকোন একটি থেকে যাত্রা করতে হবে।

    কেউ কেউ মিশরকেও তাদের পথে যুক্ত করে লয়। তারা আলেকজান্দ্রিয়া, কায়রো ও দামিয়াটা হয়ে ভ্রমণ করে। যেখান থেকে বেশ কয়েকটি জাহাজ জোপ্পা অথবা আক্রার সেন্ট জন্‌সের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। এটা খুব দূরবর্তী নয়। সেখান থেকে জেরুসালেম বা দামেস্কো। এবং সেখান থেকে বাগদাদ বা ব্যবিলন।

    যদি নৌবহরের জন্য প্রতীক্ষা না করে একক জাহাজে ভ্রমণ করতে চান, আপনি লিগর্ন থেকে নেপলস পর্যন্ত একটি জাহাজ ভাড়া করতে পারেন। নেপলস থেকে মেসিনা পর্যন্ত উপকূলের নিকটে থাকতে হবে, এবং উপকূলেই রাত্রি যাপন করতে হবে। আমি এই পথই ধরেছিলাম এবং মেসিনা থেকে সিরাকিউসে গিয়েছিলাম, এখানে দেখতে পাবেন প্রাচীন যুগের অসাধারণ পদচিহ্ন। এটি পাতাল শহরের মত। নিকটেই একটি বিশাল পাথরকে ফাঁফা করে রাখা হয়েছে, যার নীচে দাঁড়িয়ে কেউ যদি ফিসফিস করে তবে যারা শীর্ষে থাকে তারাও শুনতে পাবে। তারা এই ডায়োনিসিয়াস প্রস্তরকে বলে অত্যাচারীর কান; শীর্ষে থাকার কারণে, তিনি সহজেই বুঝতে পারেন নীচে লোকেরা তার সম্পর্কে কী বলে। তিনি সিরাকিউসের নেতৃস্থানীয়দের, যাদের সেখানে বন্দী করে রাখা হয়েছিল, তাদের আবিষ্কার করেন। সিরাকিউসের সে জৌলুস আর নেই, যা দ্বারা এটি বিশ্বখ্যাত হয়েছিল। যখন সমগ্র সিসিলির প্রধান শহর ছিল এটি তখন গ্রীস তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। কিন্তু এখানকার মাটি রসালো, মাল্টার গাল্লিজেরা এখান থেকে সহজেই খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে। শহরের পাশেই ক্যাপুচিন ফ্রায়ার্স মঠের উন্মুক্ত স্থান। এখানে সুউচ্চ প্রস্তর দুটির মধ্যবর্তী স্থানে আপনি আধাঘণ্টার মত হাঁটাহাঁটি করতে পারেন। সেখানে ছোট ছোট খুপরি রয়েছে, সাথে আছে বাগান। ফ্রায়ার্সেরা মাঝে মাঝে এখানে অবসর কাটান। এটি নিশ্চিতভাবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম আনন্দদায়ক নির্জনতার মধ্যে একটি।

    সিরাকিউস থেকে আমি মাল্টায় গিয়েছিলাম। এখানে পূর্বদিকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজগুলির জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

    তাহের আলমাহদী
    তাহের আলমাহদী
    জন্ম কুমিল্লায়। পড়াশোনা করেছেন লাকসাম নওয়াব ফয়েজুন্নেসা সরকারি কলেজ ও নোয়াখালী সরকারি কলেজে। রিযিকের সন্ধানে দেড় যুগের বেশি সময় আছেন সাউদী আরবে। সাহিত্যের চর্চা ছাত্রজীবন থেকে হলেও কোন লেখাই প্রকাশিত হয়নি। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগের বশেই গড়ে তুলেছে সাহিত্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠান এডুলিচার। এছাড়া বিনামূল্য গ্রন্থ সরবরাহের জন্য আছে এডুলিচার অনলাইন লাইব্রেরি এবং সম্পাদনা করছেন অনলাইন সাহিত্য পত্র ‘জেগে আছি’।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here
    Captcha verification failed!
    CAPTCHA user score failed. Please contact us!