সপ্তাহের সেরা

    আখ্যাত রচনা

    প্রবন্ধবানান ও উচ্চারণ, কে কার অনুগামী হবে?

    বানান ও উচ্চারণ, কে কার অনুগামী হবে?

    উচ্চারণ অভিধানগুলোতে ব্যঞ্জনবর্ণের লুপ্ত অ-কে ও দিয়ে চিহ্নিত করা হয়, বানান থেকে হসন্ত বিলুপ্ত করার প্রয়াসেই এই নূতন সমস্যার সৃষ্টি।

    সকলেই জানে ব্যঞ্জন বর্ণের মধ্যে একটি অ ধ্বনি থাকে। যেমন ক্+অ=ক। আমরা কি কখনো ক-কে কো উচ্চারণ করি? তাহলে অঙ্ক বা অর্ক উচ্চারণ করতে অং+কো বা অর্+কো কেন?

    স্বাভাবিক নিয়ম হল, হসন্ত (্) থাকলে ব্যঞ্জন শেষের উচ্চারণ হবে না। আর হসন্ত না থাকলে অ উচ্চারণ হবে। তাহলে যেখানে উচ্চারণের সমস্যা হতে পারে সেখানে হসন্তের ব্যবহার করলেই হয়। কিন্তু তা না করে শব্দের শেষ বর্ণে ও-কারের বোঝা চাপান হল!

    আমি হল, চাপান দুটি শব্দ লিখেছি! এগুলোর উচ্চারণ হল্অ, চাপান্অ। যদি হল্ (hall), চাপান্ লিখি তবে শব্দের শেষে অ উচ্চারণ হবে না। কিন্তু হল কী? হসন্ত ব্যবহার এড়িয়ে চলার নির্দেশনা দেওয়া হল, আর ছিল, করল, ধরল, বলল ইত্যাদিকে ছিলো, করলো, ধরলো, বললো বানান হল। এতে সুবিধাও একটা হয়েছে—পশ্চিমী ও-কারের প্রভাব পূর্বেও বিস্তার লাভ করেছে।

    অন্য একটি সমস্যাও ছিল। যেমন ধরল কেমন উচ্চারণ হবে? ধর্ ল না ধ র ল। শব্দটি মূলে ছিল ধরিল— ধর্-ইল। তার মানে র বর্ণে অ নেই। তাই ধর্ ল। এটাই সঠিক। এটাকে স্বচ্ছত্ব দিতে গিয়ে করা হল ধরলো—মানে শেষের অ-টি ও হয়ে গেল। তাহলে ধ-এর অ কী দোষ করল? শব্দটি ধোরলো হল না কেন?

    রবীন্দ্রনাথ বা শরৎচন্দ্রের পুরান ছাপার বই গুলোতে হোলো, কোরলো বানান পাওয়া যায়, এটা পশ্চিমী উচ্চারণের ধরণ! পূর্বী উচ্চারণ করল, হল— বানান ও উচ্চারণের নিদান দাতারা সমন্বয় করলেন— একই শব্দের আধা পূর্বী, আধা পশ্চিমী করে নতুন শৈলী তৈরি করল।

    পূর্বী যারা পশ্চিমী বানান ও উচ্চারণকে অস্বীকার করে পূর্বী ভাষার প্রচলন করতে লেখ্য ভাষায় খাইতাছি, যাইতাছির চালু করেছিল, তাদেরও হৃদয় শীতল হল।

    ভাষায় গুরুচণ্ডালী বলে একটা দোষ ছিল এককালে—সাধু-চলিত মিশ্রণ করার নাম গুরুচণ্ডালী। সে বলল, আমি খাইতাছি; খাইয়া যাইতাছি। বাক্য গুলো সাধু ভাষায় কেমন হবে? সে বলিল, আমি খাইতেছি; খাইয়া যাইতেছি। তেছি-কে তাছি-তে রূপান্তর করে বলাই হল পূর্বী বাঙালীর উচ্চারণ। কিন্তু বলিল-কে বইল্‌ল উচ্চারণ করলেই আবার আঞ্চলিকতার আখ্যা দেওয়া হয়।

    মূলত, কোন জীবিত ভাষার বানান ও উচ্চারণকে সূত্রে নির্দিষ্ট করা বড় জটিল কাজ। আর এই জটিলতাকে প্রশ্রয় যোগায় বানানকে উচ্চারণানুগ করার চিন্তা। এই জটিলতাকে সহজ করার উপায় হচ্ছে, বানান উচ্চারণের মত হবে না বরং উচ্চারণ বানানের মত হবে।

    তাহের আলমাহদী
    তাহের আলমাহদী
    জন্ম কুমিল্লায়। পড়াশোনা করেছেন লাকসাম নওয়াব ফয়েজুন্নেসা সরকারি কলেজ ও নোয়াখালী সরকারি কলেজে। রিযিকের সন্ধানে দেড় যুগের বেশি সময় আছেন সাউদী আরবে। সাহিত্যের চর্চা ছাত্রজীবন থেকে হলেও কোন লেখাই প্রকাশিত হয়নি। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগের বশেই গড়ে তুলেছে সাহিত্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠান এডুলিচার। এছাড়া বিনামূল্য গ্রন্থ সরবরাহের জন্য আছে এডুলিচার অনলাইন লাইব্রেরি এবং সম্পাদনা করছেন অনলাইন সাহিত্য পত্র ‘জেগে আছি’।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here
    Captcha verification failed!
    CAPTCHA user score failed. Please contact us!

    উ-কার ও ঊ-কারের ব্যবহার

    বাংলা বর্ণমালায় হ্রস্ব-উ ও দীর্ঘ-ঊ থাকলেও (যেমন কুল, কূল, দুর, দূর) উচ্চারণে এদের হ্রস্বতা বা দীর্ঘতা সংস্কৃতের মতো, যথাযথ রক্ষিত হয় না। এ জন্য...

    লিপিশক্তি কী ও কেন প্রয়োজন?

    আমাদের সৌভাগ্য যে, বাংলা ভাষার নিজস্ব একটি লিপি আছে। এই লিপি দিয়ে আমরা আমাদের প্রতিটি ধ্বনিকে লিখতে পারি। কিন্তু, শক্তিমান লিপিগুলোর মধ্যে বাংলার স্থান...

    আরবি ভাষার কি আঞ্চলিক রূপ আছে? — প্রথম পর্ব

    পৃথিবীর প্রতিটি কথ্য ভাষার আঞ্চলিক রূপ রয়েছে। আমাদের বাংলা ভাষা প্রধানত বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভাষা। এছাড়া ত্রিপুরা, আসাম, ঝাড়খণ্ড ও বার্মার আরাকানেও...

    অস্ কথন

    Hypothesis শব্দটি এসেছে গ্রিক hupo এবং thesis থেকে। এর plural হচ্ছে Hypotheses। প্রাচীন গ্রিক ভাষায় হাইপোথিসিস শব্দটির ব্যবহার হত নাটকে গল্পের সারসংক্ষেপ বোঝাতে। ইংরেজি ভাষায় অনুমান...

    বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব

    ভাষা নিয়ে তথ্য সংগ্রহকারী আন্তজার্তিক সংস্থা এথনোলগ্-এর সর্বশেষ ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের প্রতিবেদন (২৩ তম সংস্করণ) অনুযায়ী পৃথিবীতে ৭১১৭টি জীবন্ত ভাষা রয়েছে। এরমধ্যে ভাষাভাষী হিসেবে বাংলা...

    লেখক অমনিবাস

    আলমগীর বাদশার মৃত্যু রহস্য

    আলমগীর বাদশা মারা গিয়েছে। অনেকদিন আগের কথা, তেতুঁল তলার পুকুরের বাঁধানো ঘাটের তালের গুড়ির নিচে তার লাশ পাওয়া গিয়েছিল। গ্রামময় রাষ্ট্র হয়েছিল, দুষ্ট জীন তাকে...

    আরব্য রজনী : গাধা, বলদ ও বণিকের গল্প

    গাধা, বলদ ও বণিকের গল্প যখন তার পিতা এই কথা শুনলেন, তিনি তাকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার এবং রাজার মধ্যে যা ঘটেছিল তার সবই...

    লিপিশক্তি কী ও কেন প্রয়োজন?

    আমাদের সৌভাগ্য যে, বাংলা ভাষার নিজস্ব একটি লিপি আছে। এই লিপি দিয়ে আমরা আমাদের প্রতিটি ধ্বনিকে লিখতে পারি। কিন্তু, শক্তিমান লিপিগুলোর মধ্যে বাংলার স্থান...

    তাভেরনিয়ের ভ্রমণ : পর্ব এক

    একজন মানুষ একই সময়ে ও একই উপায়ে এশিয়া ভ্রমণ করতে পারে না, যেমনটি তারা ইউরোপ ভ্রমণ করে। শহর থেকে শহরে সাপ্তাহিক কোন গাড়ি নেই,...

    আরব্য রজনীর প্রথম রজনী

    বণিক ও ইফরিতের গল্প শাহরাজাদ বলেছিলেন: আমি শুনেছি, হে সুখী রাজা, এক ছিলেন ধনী বণিক, দেশজুড়ে ছিল তার বিভিন্ন ব্যবসায়, একদিন তিনি অশ্বারোহণে কোন একটি...

    তাভেরনিয়ের ভ্রমণ : পর্ব দুই

    কনস্টান্টিনোপল থেকে ইস্পাহান, এই পথেই লেখকের প্রথম পারস্য ভ্রমণ। এটা কদাচিৎ যে কোন কাফেলা কনস্টান্টিনোপল থেকে পারস্যে যায়; কিন্তু বুরসা থেকে তারা প্রতি দুই মাসেই...

    এই বিভাগে