Home Blog

    ‘বাংলার অক্সফোর্ড’ নবদ্বীপ : একটি বহুপ্রচলিত মিথের বিনির্মাণ

    নানা দেশ হৈতে লোক নবদ্বীপ যায়।

    নবদ্বীপে পড়িলে সে বিদ্যারস পায়॥

    অতএব পড়ুয়ার নাহি সমুচ্চয়।

    লক্ষ কোটি অধ্যাপক নাহিক নির্ণয়॥

    বৃন্দাবন দাস-রচিত চৈতন্য ভাগবত-এর পঙ্‌ক্তি চতুষ্টয়ে নিঃসন্দেহে অতিশয়োক্তি আছে। তবে পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীতে দেশের নানা জায়গা থেকে বহু মানুষ যে বিদ্যাশিক্ষার জন্য নবদ্বীপে হাজির হতেন, সেটি কোনও অতিশয়োক্তি নয়। বলা বাহুল্য, বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রে নবদ্বীপের এই দেশজোড়া খ্যাতি রাতারাতি ছড়িয়ে পড়েনি। অষ্টম-নবম শতকে পাল রাজাদের আমলে রাঢ় বাংলায় কয়েকটি বিদ্যাচর্চা কেন্দ্র গড়ে ওঠে। অনেকে মনে করেন, এই সময়েই নবদ্বীপের নিকটবর্তী সুবর্ণবিহারে বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বৌদ্ধবিহারে বৌদ্ধধর্ম ও দর্শনের পঠন-পাঠন হত। গবেষকদের অনুমান, বৌদ্ধধর্মের অবনতির সময়ে বিহারটির পতনের পরে, এই অঞ্চলের ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা কালক্রমে বৌদ্ধদের দর্শন ও ন্যায়শাস্ত্রের সারাংশ আয়ত্ত করে ন্যায় ও স্মৃতি চর্চা শুরু করেন। কাজেই এই সময় থেকে জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে নবদ্বীপের জয়যাত্রা শুরু হয় বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে।

    একাদশ-দ্বাদশ শতকে সেন রাজাদের শাসনকালে নবদ্বীপে বহু পণ্ডিতের বাসস্থান ছিল। ১২০৬ সালে রাজা লক্ষ্মণসেনের পরাজয় ও নবদ্বীপ ত্যাগের পরে এই অঞ্চল মুসলমান শাসকদের অধীনে আসে। এর পর প্রায় দুশো বছর নবদ্বীপের শিক্ষাদীক্ষা ও সাহিত্যচর্চার ইতিহাস সম্পর্কে প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় না। যদিও সে সময়ে নবদ্বীপে বিদ্যাচর্চা সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়— এ কথা মনে করা সঙ্গত নয়। কারণ এই দীর্ঘ সময়ে জ্ঞানচর্চার ধারা অব্যাহত না থাকলে পঞ্চদশ শতকে সহসাই নবদ্বীপে এই পরিমাণ প্রথম সারির পণ্ডিতের উপস্থিতি আদৌ সম্ভব নয়। তাই অনুমান করা যায়, সেন আমলে নবদ্বীপে বসবাসকারী পণ্ডিতদের উত্তরসূরীরা ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকে শাসকগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিদ্যাচর্চায় নিরন্তর নিয়োজিত ছিলেন। অতঃপর পঞ্চদশ শতক থেকে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে শাসকবর্গের যুগপৎ উদারতা প্রদর্শন ও আর্থিক আনুকূল্যের ফলে প্রধানত নবদ্বীপকে কেন্দ্র করে সারা বাংলায় ন্যায়, নব্যন্যায়, স্মৃতি, তন্ত্রশাস্ত্র, জ্যোতিষ ও সামগ্রিকভাবে সংস্কৃত চর্চার বিকাশ ঘটে।

    বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলা চলে, পঞ্চদশ শতকের প্রথম ভাগে নরহরি বিশারদ নবদ্বীপে সর্বপ্রথম চতুস্পাঠী স্থাপন করে ন্যায়, স্মৃতি ও বেদান্তের অধ্যাপনা শুরু করেন। এই সময়ে শ্রীহট্ট থেকে শ্রীচৈতন্যের মাতামহ নীলাম্বর চক্রবর্তী, রাজপণ্ডিত সনাতন মিশ্র ও আরও অনেকে নবদ্বীপে আসেন। কৃষ্ণদাস কবিরাজের শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত থেকে জানা যায়, এঁদের মধ্যে স্মৃতি ও জ্যোতিষ শাস্ত্রের অধ্যাপক নীলাম্বর চক্রবর্তী ছিলেন নরহরি বিশারদের সহপাঠী। এই শতাব্দীর দ্বিতীয় পাদে (আনুমানিক ১৪৪৫ সালে) নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন বিখ্যাত পণ্ডিত বাসুদেব সার্বভৌম। সার্বভৌম তাঁর পিতা নরহরি বিশারদের কাছে ন্যায় ও বেদান্ত অধ্যয়ন করে কালক্রমে স্মৃতি, ন্যায়, ন্যায়বৈশেষিক, মীমাংসা ও বেদান্ত শাস্ত্রে সুপণ্ডিত হয়ে ওঠেন। পরিণত বয়সে তিনি ওড়িশারাজ পুরুষোত্তম দেবের সভাপণ্ডিত হন এবং পুরীতে শ্রীচৈতন্যের সংস্পর্শে এসে অন্যতম প্রধান চৈতন্যভক্ত হয়ে ওঠেন।

    বাসুদেব সার্বভৌমের পরে নবদ্বীপের অন্যতম প্রধান পণ্ডিত হিসেবে বিবেচিত রঘুনাথ শিরোমণি শ্রীচৈতন্যের প্রায় ৪০ বছর আগে শ্রীহট্টে জন্মগ্রহণ করেন। রাজা সুবিদনারায়ণের খঞ্জা কন্যাকে বিবাহ করে রঘুনাথের জ্যেষ্ঠ সহোদর রঘুপতি প্রচুর ভূসম্পত্তির অধিকারী হন। এই বিবাহে ক্রুদ্ধা হয়ে তাঁর জননী সীতা দেবী দ্বিতীয় পুত্র রঘুনাথকে নিয়ে শ্রীহট্ট ত্যাগ করেন এবং নিঃস্ব অবস্থায় নবদ্বীপে নৈয়ায়িক বাসুদেবের গৃহে আশ্রয় নেন। যদিও এই বাসুদেবই সুবিখ্যাত বাসুদের সার্বভৌম কি না, সে বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে। ইতিহাসবিদ যজ্ঞেশ্বর চৌধুরীর মতে, বাসুদেব সার্বভৌমের কাছে ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়ন করেই রঘুনাথ মহানৈয়ায়িক হন।[১] অন্য দিকে দীনেশচন্দ্র সেন জানিয়েছেন: “সুবিস্তৃত বৈষ্ণব সাহিত্যে, চৈতন্য-চরিতামৃত, চৈতন্য-ভাগবত, চৈতন্য-মঙ্গল প্রভৃতি চরিতাখ্যানে— কোথায়ও রঘুনাথ শিরোমণির নামের উল্লেখপর্যন্ত নাই। বাসুদেব সার্ব্বভৌম-সংক্রান্ত নানা কাহিনী বৈষ্ণব গ্রন্থগুলিতে বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ হইয়াছে, তাহার কোনটিতে প্রাসঙ্গিক ভাবে রঘুনাথের সঙ্গে সার্ব্বভৌমের কোন সংশ্রব সূচিত হয় নাই। রঘুনাথ শিরোমণি তাৎকালিক নবদ্বীপের পণ্ডিতগণের মধ্যে দিক্‌পালস্বরূপ ছিলেন— বৈষ্ণব-সাহিত্য তৎসম্বন্ধে একেবারে নীরব। এতদ্বারা সহজেই মনে হয়, তিনি বৈষ্ণবদিগের কিংবা বাসুদেব সার্ব্বভৌমের কেহ ছিলেন না।”[২] তবে রঘুনাথ শিরোমণিই যে বাংলায় নব্যন্যায়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং তাঁর সুবাদেই যে নবদ্বীপ বিদ্যাসমাজের ভারতজোড়া খ্যাতি, এ বিষয়ে কোনও মতভেদের অবকাশ নেই।

    বাসুদেব সার্বভৌম ও রঘুনাথ শিরোমণির আবির্ভাবের ফলে নব্যন্যায়ের পঠন-পাঠন, গ্রন্থ রচনা ও ন্যায়শাস্ত্রের টীকা রচনায় নবদ্বীপের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন হলেও যাঁর সুবাদে ষোড়শ শতকের শেষার্ধে স্মৃতিশাস্ত্রের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে নবদ্বীপের খ্যাতি তুঙ্গে ওঠে, তিনি হলেন স্মৃতিকারদের প্রধানতম ব্যক্তি ও ‘বাংলার মনু’ হিসেবে বিবেচিত রঘুনন্দন ভট্টাচার্য। মহামহোপাধ্যায় পি. ভি. কাণের মতে, রঘুনন্দন ১৫২০ সালে নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। স্মার্ত পণ্ডিত হরিহর ভট্টাচার্যের পুত্র ও বিখ্যাত স্মার্ত পণ্ডিত শ্রীনাথ আচার্যের সুযোগ্য ছাত্র রঘুনন্দন অষ্টাবিংশতি স্মৃতিতত্ত্ব রচনা করে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর এই বিখ্যাত গ্রন্থের ‘দায়ভাগতত্ত্ব’, ‘প্রায়শ্চিত্ততত্ত্ব’ এবং ‘একাদশীতত্ত্ব’ বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে।

    তবে কেবল ন্যায় ও স্মৃতি চর্চাই নয়, তন্ত্রশাস্ত্র চর্চার ক্ষেত্রেও নবদ্বীপের পণ্ডিতেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মহেশ্বর গৌড়াচার্যের জ্যেষ্ঠ পুত্র কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ ভট্টাচার্যের সুবাদে নবদ্বীপে আগমশাস্ত্র বা তন্ত্রশাস্ত্র চর্চা শুরু হয়। কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ ষোড়শ শতকের শেষভাগে অথবা সপ্তদশ শতকের প্রথম দশকে জন্মগ্রহণ করেন। তন্ত্রশাস্ত্রে সুপণ্ডিত আগমবাগীশ প্রায় ১৭০টি মূলতন্ত্র ও উপতন্ত্র থেকে মূল নির্যাস গ্রহণ করে প্রামাণ্য গ্রন্থ বৃহৎ তন্ত্রসার রচনা করেন। এই মহামূল্যবান গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল, এই সংকলন গ্রন্থে শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব, সৌর ও গাণপত্য সম্প্রদায়ের তন্ত্রগুলির সারবস্তু লিপিবদ্ধ করা হয়।

    ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের পরে, ব্রিটিশ শাসকরা বাংলা ও বাংলার বাইরে শিক্ষাবিস্তারের উদ্ভব ও বিকাশ স্থল মধ্যযুগের নবদ্বীপকে ‘Oxford of Bengal’ আখ্যায় ভূষিত করা শুরু করেন। এহেন বিশেষণের পেছনে ঔপনিবেশিক শাসকদের মূল প্রতিপাদ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অক্সফোর্ডের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা। দুঃখজনক হলেও এ কথা সত্যি, নবদ্বীপ তথা বাংলার বাসিন্দারা এই অভিধাটি সম্পর্কে কোনও প্রতিবাদ করেন না, বরং যথেষ্ট শ্লাঘা বোধ করেন। অথচ জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে নবদ্বীপ ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামুলক বিচার করলে এই ঔপনিবেশিক অভিধাটি যে প্রকৃতপক্ষে কতটা অসার, অযৌক্তিক ও অপমানজনক— তা সহজেই বোঝা যায়।

    প্রথমত, প্রাচীনত্বের দিক থেকে নবদ্বীপের থেকে অক্সফোর্ড এগিয়ে ছিল, এমন কোনও পাথুরে প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং নথিপত্র থেকে জানা যায়, দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথম পাদে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্ব (Theology) ও আইন পড়ানো শুরু হয় এবং শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ১১৮৫ ও ১২০৯ সালে যথাক্রমে অক্সফোর্ড ও কেম্ব্রিজের সুনির্দিষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়।[৩] অথচ দ্বাদশ শতাব্দীর বহু আগে থেকেই যে নবদ্বীপে পূর্ণ উদ্যমে জ্ঞানচর্চা শুরু হয়, সেই আলোচনা আমরা আগেই করেছি।

    দ্বিতীয়ত, অক্সফোর্ডের ছাত্রসংখ্যাও কোনও অংশেই নবদ্বীপের সঙ্গে তুলনীয় ছিল না। এ প্রসঙ্গে দীনেশচন্দ্র সেন ১৭৯১ সালের Calcutta Monthly পত্রিকার জানুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত প্রতিবেদন উল্লেখ করে জানান: “এখন (১৭৯১ খৃঃ) এক নবদ্বীপের টোলেই প্রায় ১,১০০ ছাত্র এবং ১৫০ জন অধ্যাপক আছেন। কিন্তু এই টোলগুলির অবস্থা পড়ন্ত দশায়। রাজা রুদ্রের সময়ে অবস্থা ইহাপেক্ষা অনেক ভাল ছিল।”[৪]

    এর প্রায় ১০০ বছর আগে নবদ্বীপের টোলগুলিতে ছাত্রসংখ্যা আরও বেশি ছিল, সে কথা জানিয়ে তিনি লেখেন: “রাজা রুদ্রের সময়ে (১৬৮০ খৃঃ) ছাত্রসংখ্যা ছিল ৪,০০০ এবং অধ্যাপক ছিলেন ছয় শত।”[৫] এর পাশাপাশি রানি অ্যান [শাসনকাল: ১৭০২-১৭১৪] ও রাজা প্রথম জর্জ [শাসনকাল: ১৭১৪-১৭২৭]-এর রাজত্বকালে অক্সফোর্ডে বার্ষিক ছাত্রসংখ্যা ছিল মাত্র ৩০০ জন। ১৭২৬ থেকে ১৮১০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এই সংখ্যা আরও কমে ২০০-এর নীচে নেমে আসে।[৬] এমনকি উনিশ শতকের শুরুর দিকেও অক্সফোর্ডের ১৯টি কলেজে ছাত্র ছিল মাত্র ৫০০ জন। ১৮২০-২৪ সাল নাগাদ তা বেড়ে ১৩০০ জনে দাঁড়ায়। তবে ছাত্রসংখ্যার অনুপাতে অধ্যাপকদের সংখ্যা আদৌ বৃদ্ধি পায়নি। ১৮০০ সালে যেখানে অধ্যাপকের সংখ্যা ছিল সাকুল্যে ১৯ জন, ১৮৫৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় মাত্র ২৫ জনে।[৭] অথচ প্রতিবেদনে উল্লিখিত নবদ্বীপের ‘টোলগুলির পড়ন্ত দশা’-তেও আমরা ১,১০০ ছাত্র ও ১৫০ জন অধ্যাপকের উপস্থিতির কথা জানতে পারি।

    শুধু বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের শিক্ষাব্যবস্থাই নয়, উনিশ শতকে ইংল্যান্ডের স্কুলশিক্ষার চিত্রও আহামরি ছিল না। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের প্রধান দুটি ‘পাবলিক স্কুল’ ইটন ও ওয়েস্টমিনস্টারে ছাত্রসংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। অ্যাডামসনের গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৭৫৪ থেকে ১৭৬৫ সাল পর্যন্ত ইটনের ছাত্রসংখ্যা ছিল ৫০০ জনের সামান্য বেশি। ১৭৬৫-১৭৮৮ সময়কালে সেই সংখ্যা আরও কমে মাত্র ২৩০ জনে নেমে আসে। অন্য দিকে ১৭২৭ সালে ওয়েস্টমিনস্টারে ছাত্রসংখ্যা ছিল ৪৩৪ জন এবং ১৭৬৫ থেকে ওই শতকের শেষে তা কমে ২৫০ থেকে ৩০০ জনে দাঁড়ায়।[৮]

    বিদ্যালয়গুলিতে কেবল ছাত্রস্বল্পতাই ছিল না, পাঠ্যক্রমও ছিল অত্যন্ত অনুন্নত। ১৮৩৪ সালেও ইংল্যান্ডের অধিকাংশ জাতীয় স্কুলে পাঠ্যক্রম মূলত ধর্মীয় শিক্ষা এবং লেখা-পড়া-অঙ্ক (The three ‘R’s) শেখার ওপর সীমাবদ্ধ ছিল। এমনকি অমঙ্গলের আশঙ্কায় অনেক গ্রামীণ স্কুলে লেখাটুকুও শেখানো হত না।[৯] ইটনের মতো নামকরা স্কুলের চিত্র জানিয়ে অ্যাডামসন বলেছেন: “In public schools like Eton, teaching consisted of writing and arithmetic (a number of English and Latin books were studied); while those in the fifth form also learnt ancient Geography, or Algebra.” তবে ‘not till 1851 that Mathematics became a part of the regular school work’।[১০] বিদ্যালয় স্তরে এই ছাত্রস্বল্পতা ও অনুন্নত পাঠ্যক্রমের কারণেই ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শিক্ষাদানের মান সম্পর্কে অ্যাডামসন বলেন: “The fact meant that the English universities were regarded not so much as places of learning, as advanced schools which continued the education begun in the schools below them.”[১১] এর পাশাপাশি নবদ্বীপের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি ফেরালে এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

    তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতামান এবং শিক্ষা সমাপ্ত করার সময়কালের বিষয়েও অক্সফোর্ডের সঙ্গে নবদ্বীপের যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান ছিল। যেখানে ১৫-১৬ বয়সী ছাত্ররা অক্সফোর্ডে ভর্তি হয়ে মাত্র ৪ বছরে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করত, সেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত নবদ্বীপের অধিকাংশ ছাত্রই ছিল প্রৌঢ়বয়স্ক এবং অন্ততপক্ষে ৮ থেকে ১০ বছরের আগে তাদের শিক্ষা সমাপ্ত হত না। এ বিষয়ে পূর্বে উল্লিখিত ক্যালকাটা মান্থলি জানায়: “বহু দূরদেশ হইতে নদীয়াতে ছাত্র-সমাগম হয়, এই আগন্তুক ছাত্রমণ্ডলী অধিকাংশই প্রৌঢ়বয়স্ক। কারণ তাঁহারা বহুকাল অন্তত দর্শনাদি অধ্যয়ন করিয়া নবদ্বীপে ন্যায়দর্শন পাঠ করিবার যোগ্যতা অর্জন করেন। এতদূর পড়িয়া শুনিয়া আসিয়া নবদ্বীপে শিক্ষা সমাপ্ত করিতে তাঁহাদের বিশটি বৎসরের দরকার হয়।”[১২] ১৭৯১-এ প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের প্রায় ৭৫ বছর পরে ১৮৬৭ সালে, কলকাতা সংস্কৃত কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ই. বি. কাওয়েল নবদ্বীপের টোলগুলি পরিদর্শন করে সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেন।

    তাঁর প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়বস্তুর সঙ্গে ক্যালকাটা মান্থলি-র প্রতিবেদনের আশ্চর্য সাযুজ্য পরিলক্ষিত হয়। ওই প্রতিবেদনে কাওয়েল লেখেন: “নবদ্বীপে প্রধানতঃ স্মৃতি ও ন্যায় পড়ানো হইয়া থাকে। এই বিষয়ে নবদ্বীপের খ্যাতি ভারতব্যাপী। বিশেষতঃ ন্যায় পড়িবার জন্য এখানে ভারতবর্ষের সর্ব্বস্থান হইতে ছাত্র আসিয়া থাকে। আমি আমার অবস্থিতিকালে প্রৌঢ়বয়স্ক, এমন কি যাহাদের চুল প্রচুর পরিমাণে পাকিয়া গিয়াছে, এমন সকল পড়ুয়াকে লাহোর, পুনা, তামিল দেশ, এমন কি মিথিলা ও নেপাল প্রভৃতি স্থান হইতেও আসিতে দেখিয়াছি। স্মৃতির টোলে সাধারণতঃ ৮ বৎসর পড়িতে হয়। ন্যায়ের টোলে ১০ বৎসরের নীচে কিছুতেই হয় না। …লাহোর হইতে ত্রিবাঙ্কুর পর্য্যন্ত বহুদেশ হইতে ছাত্রগণ নবদ্বীপে আসিয়া থাকে। নবদ্বীপের উপাধি পাইলে ভারতীয় সমস্ত বিদ্যাকেন্দ্রে সেই পণ্ডিত সম্মানিত হন। যদিও বৎসরের কয়েকমাস টোলগুলি বন্ধ থাকে, বাকী কয়েক মাস ছাত্রগণ প্রাণান্ত পরিশ্রম করিয়া এই ক্ষতি পূরণ করিয়া থাকেন।”[১৩]

    যেখানে অষ্টাদশ শতকের নবদ্বীপে ‘প্রৌঢ়বয়স্ক ছাত্রমণ্ডলী’-র শিক্ষা সমাপ্ত করতে ‘বিশটি বৎসরের দরকার হয়’ কিংবা উনিশ শতকে নবদ্বীপের টোলগুলির ‘পড়ন্ত’ দশাতেও যেখানে পড়ুয়াদের একটি বিষয়ে অন্ততপক্ষে ৮ থেকে ১০ বছর পড়তে হয়; সেখানে অষ্টাদশ শতকের ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পড়ুয়া কী অনায়াসে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করত, তার বিবরণ দিয়ে টমাস শেরিডান জানিয়েছেন: “When a boy can read English with tolerable fluency, which is generally about the age of seven or eight years, he is put to school to learn Latin and Greek; where seven years are employed in acquiring but a moderate skill in those languages. At the age of fifteen or thereabouts, he is removed to one of the universities, where he passes four years more in procuring a more competent knowledge of Greek and Latin, in learning the rudiments of logick, natural philosophy, astronomy, metaphysics, and the heathen morality. At the age of nineteen or twenty a degree in the arts is taken, and here ends the education of a gentleman.”[১৪] এই প্রসঙ্গে ডবসের গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি যে, উনবিংশ শতাব্দীর ‘আলোকিত’ ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ইটন স্কুলে অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে পড়ুয়াদের ছাত্রজীবনের গড় দৈর্ঘ্য ১৮৩৫-এ এক বছর থেকে বেড়ে ১৮৫১ সালে মাত্র দু’বছর হয়।[১৫]

    সর্বোপরি, অষ্টাদশ শতকের প্রথমভাগ পর্যন্ত জ্ঞানচর্চার পীঠস্থান নবদ্বীপ কোনও আমলেই অক্সফোর্ডের মতো কেন্দ্রীভূত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিকশিত হয়নি। বরং দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করে উচ্চশিক্ষার চর্চাকেন্দ্র হিসেবে নবদ্বীপ ছিল বিকেন্দ্রীভূত এবং সম্পূর্ণ অবৈতনিক। নবদ্বীপের বিখ্যাত পণ্ডিতবর্গ শিক্ষার্থীদের কেবল বিনা বেতনেই পড়াতেন না, তাদের খাওয়া-পরা ও বাসস্থানেরও বন্দোবস্ত করতেন। এ বিষয়ে অধ্যাপক কাওয়েল লেখেন: “পূর্ব্বকালে গ্রীস দেশে যেরূপ লেখাপড়ার উচ্চাঙ্গ অনুশীলন হইত এবং যাহার বিবরণ আমরা মাঝে মাঝে প্লেটোর ‘বাদানুবাদে’ (Controversies) পাই, আশ্চর্যের বিষয় নবদ্বীপে আমরা সেই প্রাচীন সময়ের একটা ধারা যেন সাক্ষাৎ সম্বন্ধে দেখিতে পাইলাম। বিদ্যাদান করিয়া অর্থগ্রহণ করা ইঁহারা পাপ মনে করেন; পণ্ডিতেরা শুধু বিনাবেতনে ছাত্রদিগকে পড়াইয়া ক্ষান্ত থাকেন না, পরন্তু তাহাদের খাওয়াপরা ও বাসস্থান যোগাইয়া থাকেন। ইঁহারা বড়লোকদের সামাজিক ধর্মকার্য্যে বিদায় এবং নানারূপ ব্যাপারে দক্ষিণা লাভ করিয়া এই সমস্ত খরচ নির্ব্বাহ করেন।”[১৬] অথচ ১৮৫০ সাল নাগাদ অক্সফোর্ডে চার বছর শিক্ষাগ্রহণের শেষে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের জন্য একজন পড়ুয়াকে প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ পাউন্ড খরচ করতে হত।[১৭]

    এই আলোচনার শেষে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা চলে, জ্ঞানচর্চার প্রাচীনত্ব বা টোলগুলিতে ছাত্র ও অধ্যাপক সংখ্যার প্রাচুর্য অথবা ভর্তি হওয়ার যোগ্যতামান ও শিক্ষা সমাপ্ত করার সময়কাল কিংবা টোলগুলির গঠনগত ও পরিচালনগত পদ্ধতি— কোনও দিক থেকেই মধ্যযুগের নবদ্বীপের সঙ্গে অক্সফোর্ডের সামান্যতম সাদৃশ্যও চোখে পড়ে না। বরং যে সময়কালে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে নবদ্বীপ দক্ষতার শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করে, সেই একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অক্সফোর্ড অতি সাধারণ মানের বিদ্যাচর্চার স্থান হিসেবে পরিগণিত হতে বাধ্য। একই সঙ্গে মনে রাখা জরুরি, উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে অক্সফোর্ড যখন ক্রমেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পড়ুয়াদের কাছে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যস্থল হয়ে ওঠে, তখন নবদ্বীপের জ্ঞানচর্চার গরিমা প্রায় অস্তমিত। তাই সব দিক বিবেচনা করে এ কথা বলাই সঙ্গত, অক্সফোর্ডকে যেমন ‘ব্রিটেনের নবদ্বীপ’ বলার যৌক্তিকতা নেই; ঠিক তেমনই নবদ্বীপকেও ‘বাংলার অক্সফোর্ড’ আখ্যায় আখ্যায়িত করা শুধু অনৈতিহাসিকই নয়, অসমীচীনও বটে।

    কেউ আমার প্রতিদ্বন্ধী না

    বিশ্বাস ছিল আকাশ সমান
    ঠুনকো না।
    তবু একজীবনে কেন তুমি
    আমার হয়েই রইলে না,
    সত্যিটা আজও জানা হলো না।
    প্রিয় কাঙ্ক্ষিত সম্পদ হিসেবে
    শুধু ভালোবাসাই তো চেয়েছিলাম
    দিলেনা উজাড় করে সবটুকু উষ্ণতা ।
    তুমি যক্ষ হয়ে বক্ষে আগলে কেন রাখলে না
    জানি না।
    আমি শুধু জানি
    কেউ তো আমার প্রতিদ্বন্দ্বী না,
    আর না আমিও কারোর প্রতিদ্বন্দ্বী।

    হিজড়াদের সামাজিক পুনর্বাসন সম্ভব কি?

    রাজা-বাদশাহদের যুগে কিছু মানুষের পুরুষত্ব নষ্ট করে নপুংশক বানান হত, মোঘল প্রাসাদ, ভারতবর্ষে নবাবদের প্রাসাদ এবং ইরানে এই ধরনের লোকেদের বলা হত খোজা, ওসমানীয় প্রাসাদে তারা পরিচিত ছিল আগা নামে।

    তাদের প্রধান কাজ ছিল হেরেম পাহারা দেওয়া। প্রাসাদে গুরুত্বপূর্ণ নারীদের খাদেম হিসেবে এক বা একাধিক খোজা বা আগা থাকতেন। তাদের অনেকেই ভাল যোদ্ধা, কূটনীতিবিদ ও ধনবান ছিলেন। দরিদ্র লোকেরা আয়েশী জিন্দেগীর লালুচে খোজা বা আগা হত। অনেকে তীব্র যন্ত্রনা অথবা ক্ষত না শুকানোর কারণে মারাও যেতেন।

    ভারতবর্ষে বাদশা-নবাবের শাসনাবসান হলে বিপুল সংখ্যক খোজা বেকার হয়ে পড়ে—যেহেতু অস্ত্রচালনা তাদের জানা ছিল, তারা দলবদ্ধ হয়ে ডাকাতি-লুণ্ঠন শুরু করে। ইংরেজ সরকার বহু তেল-খড় পুড়িয়ে এদের দমন করলেও একেবারে নির্মূল করতে পারেনি! এরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন প্রদেশে চলে যায়। এরপর প্রদেশ ভেদে এদের ভিন্ন ভিন্ন নাম হয়। কিন্তু বৈধ আয়ের উৎস না থাকায়—তাদের গোপন দুষ্কৃতি চালু থাকে।

    এককালে যাদের আয়েশী জিন্দেগী ছিল, বাদশা-নবাবেরা যাদের কাছে সম্পদ গচ্ছিত রাখতে ভয় পেত না, তারা হয়ে গেল ভিখারী, ডাকাত সম্প্রদায়।

    খোজা বা আগাদের সকলেই যে চিকিৎসার মাধ্যমে পুরুষত্ব নষ্ট করতেন তা নয়, তাদের মধ্যে প্রাকৃতিক ভাবে পুরুষত্বহীন লোকেরাও ছিল।

    প্রাসাদী খোজারা জৌলুষহীন হওয়ার পর তাদের সাথে এসে জোটে স্ত্রী লক্ষণাক্রান্ত হিজড়ারাও। শুরুতে নাচ-গানের সুবিধার জন্য হলেও পরে বিকৃত যৌনাচার পেয়ে বসে তাদের। সে সিলসিলা এখনও চলমান।

    বর্তমানে তৃতীয় লিঙ্গ বলি আর যাই বলি, শহরে-গ্রামে, যানবাহনে, বিয়ে বা শিশুর জন্মের পর হিজড়ারা কী করে সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। শোনা যায়, অনেকে কাজ-কর্ম জোটাতে না পেরে গোপনে অপারেশন করে হিজড়াদের সাথে মিশে যায়। এর জন্য ঢাকায় দালালচক্রও রয়েছে!

    বহু বছর যাবৎ হিজড়াদের বিষয়ে সরকার বা সমাজ মাথাঘামায়নি! বেশ কয়েক বছর যাবৎ এনজিওদের কার্যক্রমে সমাজের মূলধারায় হিজড়াদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এতে সুবিধা কতটুকু হয়েছে তা নজরে না এলেও এনজিওগুলো হিজড়াদের জাতে তুলতে গিয়ে যে রূপান্তরকামী সমস্যার সৃষ্টি করেছে তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

    হিজড়াদের সুস্থ্য সমাজে ফিরিয়ে সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করার সদিচ্ছা থাকলে সরকার ও এনজিওদের সেই সুযোগ আছে। ব্রাকের কথাই বলি,— ব্রাক চাইলে আড়ং ও তাদের ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পে হিজড়াদের চাকরি দিতে পারে। সরকার চাইলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী হিসাবে তাদের নিয়োগ দিতে পারে। পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীতে তাদের কাজ দিলে, আমার মনে হয় হিজড়ারা সফলতা দেখাতে সক্ষম হবে। মেট্রোসহ ট্রেনের টিকেট চেকারদের কাজ হিজড়াদের দিলে সরকার লাভবান হতে পারে।

    স্বভাবতই হিজড়াদের চাহিদা খুব বেশি হবে না, আমৃত্যু স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের নিশ্চয়তা পেলে তারা ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়ানোর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

    পাঠ্যপুস্তকে নানা নীতিকথামূলক গল্প প্রবন্ধ পড়ে কতজন বাংলাদেশি সৎমানুষ হয়েছে তার প্রমাণ করার সুযোগ নেই! শরীফার গল্প পড়ে হিজড়াদের প্রতি সুস্থ শিশুরা যে খুব মানবিক হবে এই আশার গুড়ে বালি। এই নিয়ে হৈচৈ করা যাবে, দলে দলে বিভক্ত হওয়ার জন্মগত স্বভাব বাঙালির, তারা দলে দলে কোন্দল করতে পারবে। এতে হিজড়াদের মানবিক মর্যাদা যেমন বাড়বে না, তাদের জীবনযাত্রারও উন্নয়ন হবে না। হিজড়াদের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে যে পরিবার তাদের বোঝা মনে করে তাড়িয়ে দিয়েছে সেই পরিবারই তাদের পায়রুবি করবে। যে সমাজ তাদের ঘৃণার চোখে দেখে, অবহেলা করে সেই সমাজ তাদের সম্মানের চোখে দেখবে।

    যারা হিজড়াদের অধিকার নিয়ে হৈচৈ করছেন, তারা হলফ করে বলুন তো, কোনদিন কোন হিজড়াকে ডেকে পাশে বসিয়েছেন? ভালবেসে খেতে দিয়েছেন? কোনদিন বলেছেন, তুমিও আমার মত মানুষ, এসো তোমাকে একটা কাজ জুটিয়ে দিচ্ছি তুমি কাজ করে খাও। কোনদিন বলেছেন, ধরো, কয়টা টাকা নাও, চাঁদাবাজি না করে ঝালমুড়ি বিক্রি করে আয় করো!

    গলাবাজি করা সহজ, এই যেমন আমি করছি— হিজড়া তৃতীয় লিঙ্গ নয়, ক্লীব নয়,— সে কারো পুত্র, কারো কন্যা! রাষ্ট্র, সমাজ, কথিত হিজড়ার মানবিক অধিকারে সোচ্চার লোকেরা কোনদিন খোঁজ নিয়েছেন, হিজড়ারা মৌরসি সম্পদ পায় কিনা? এইসব আপনারা বলবেন না, কেননা, এইসবে আপনাদের লাভ কিছু নেই। লোকেরা লাভের আশায় কুত্তার গাড়িও দৌঁড়ায়।

    মোহমত্ত জীবন

    মোহমত্ত জীবন আহা
    মোহের কী যে দশা!
    তুমি মত্ত হইলে তাহে
    হইবে জীবন সর্বনাশা।
    যেমন পতঙ্গ মরিছে
    জ্বলন্ত প্রদীপে পুড়িয়া,
    তাহার সৌন্দর্য দেখিয়া।
    হরিণ মরিছে কানে শুনিয়া
    ব্যাধের বংশীধ্বনিতে মজিয়া।
    কালো ভ্রমরও যায় মরিয়া
    পদ্ম গন্ধে মুগ্ধ হইয়া,
    আহুতি দেয় তাহাতে ডুবিয়া।
    মৎস্য মরিছে ব্যাকুল হইয়া…
    স্বীয় জিহ্বার সেবা করিয়া,
    বড়শীসুদ্ধ খাদ্য ফেলে গিলিয়া।
    হস্তীও যে মোহের পুত্তলিকা
    মরিছে সেও উন্মত্ত হইয়া…
    শিকারীর ফাঁদে পড়িয়া।
    আহা মোহের কী ভয়ানক ক্ষমতা!
    মানব জীবনও এর বাহিরে না
    পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের পাঁচটি বাসনা
    মানবেরে সর্বদাই রয়েছে ঘিরিয়া।

    হেরে যাইনি আমি

    হেরে তো যাইনি আমি
    হারিয়েও যাইনি পথে,
    অস্তিত্বে রয়ে গেছি স্বকীয়।
    পদচ্ছাপ ঠিক রয়েছে ঘরময়
    বিলীন হয়নি আজও।
    অনুভবের অনুবাদ তোলপাড়
    তব স্মৃতিতে ভ্রমণ অগণন
    সময়ের আলোড়ন প্রাণবন্ত স্মৃতি
    পদচ্ছাপ আর যতো ইতি-উতি,
    গৃহস্থালি, গিন্নিপনা ঘরে-দোরে
    রয়েছে ঘাটে-ঘাসে-মাটিতে,
    উনুনে-পাত্রে,টেবিলে-চেয়ারে
    সর্বত্র, গৃহপালিত অস্তিত্ব।
    স্বাধীন কল্পনা জয়ের ইচ্ছে…
    ঘরকুনো ভাবনা শরিক হয়েছে
    অবাধ অবারিত শান্ত সমীরে।

    নয়, নয়, নয় এ মধুর খেলা

    নয় শব্দটা নঞর্থক হলেও গণিতের হিসাবে ওটাই সবচেয়ে বড় ডিজিট বা একাঙ্ক সংখ্যা। কী বলা যায় একে, লৌহিক? ও হো, যারা আমার এই পাতি ঠাট্টাটা বুঝতে পারলেন না, তাদের জ্ঞাতার্থে বলি, লৌহিক হচ্ছে আয়রনি। বাজে পান হল? লোহা একটা শক্তপোক্ত কঠিন ধাতু, তাকে না গলিয়ে পান করা তো সম্ভব না। কিন্তু লোহাকে গলাতে দেখেছেন কেউ? আয়রন ও স্টিল ফ্যাক্টরিতে লোহা গলন্ত অবস্থাতেই বানানো হয়, কিন্তু সেখানে গিয়ে আর কে দেখতে গেছে গলানো লোহা? গরম করলে কঠিন তরলে পরিণত হয়, সেটা সবাই জানে, কিন্তু যতটা গরম আমরা সাধারণভাবে দেখে থাকি, তাতে লোহা গরম করলে তা কালো ধাতু থেকে লাল রঙের এক গনগনে আলো বিচ্ছুরণকারী জিনিসে বদলে যায়। স্যাঁকরার ঠুকঠাক, কামারের এক ঘা – কামার বা কর্মকার সেই ঘা মারে ওই গনগনে লাল লোহায়, পিটিয়ে বানায় কাজের জিনিসপত্র।

    নয়-এর কথা বলতে গিয়ে কোত্থেকে কামার এসে গেল! পান না ছাই, একেই বলে ধান ভানতে শিবের গীত। তবে হ্যাঁ, নয় সংখ্যাটার সাথে কামারের যোগ একেবারে যে নেই, তা নয়। নবশাখ বলে একটা কথা আছে হিন্দুদের জাতপাত-অধ্যুষিত সিস্টেমে, সেই ন’টা শাখা হল তিলি, তাঁতী, মালাকার, নাপিত, বারুই, সদ্‌গোপ, ময়রা, কুমোর এবং হ্যাঁ, কামার। যথাক্রমে তেল, কাপড়, ফুল, চুল, পান, দুধ, মিষ্টি, মৃৎপাত্র আর ধাতব বস্তু নিয়ে এদের কারবার।

    এ তো সবে শুরু। নয়ের আরো অনেক গুণ। আমরা যে একে চন্দ্র, দুয়ে পক্ষ পড়েছি, তাতে নয়ে নবগ্রহ। বিজ্ঞানের বইতে ছিল সেই ন’টা গ্রহ হল সূর্যের থেকে দূরত্ব অনুযায়ী যথাক্রমে বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন ও প্লুটো। এখন প্লুটো সে গুরুত্ব হারিয়েছে। কিন্তু শাস্ত্রমতে এই ন’টা গ্রহ হল সপ্তাহের সাতটা দিনের নামে, অর্থাৎ রবি (মানে সূর্য), সোম (মানে চাঁদ), মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি আর তারসাথে রাহু আর কেতু। শেষদুটো সূর্য আর চাঁদকে মাঝে মাঝে রেগে গিয়ে খেয়ে ফেলে, তাই ওদের ‘গেরোন’ লাগে!

    এসব পড়তে ভীষণ বোরিং লাগছে? রসকষহীন বলে? ওয়েল, রসের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, কাব্যে রসের সংখ্যাও সেই ন’টা। এরা হল আদি বা শৃঙ্গার রস, হাস্যরস, করুণরস, রৌদ্ররস, বীররস, ভয়ানকরস, বীভৎসরস, অদ্ভুতরস ও শান্তরস। এটা জেনে যারা ভাবছেন, ও মা, তাই নাকি, এটা তো জানতুম না, কাব্য না পড়েও তাদের মধ্যে যে রসের সঞ্চার হচ্ছে, সেটাকে অদ্ভুতরস বললে কেউ আপত্তি করবে?

    ও হ্যাঁ, নবরত্নের কথা আমি আর কী বলব! বিক্রমাদিত্যের রাজসভায় শ্রেষ্ঠ রত্নটি ছিলেন কবি কালিদাস। আর যে আটটি সভাপণ্ডিত ছিলেন, তাঁরা হলেন বররুচি, অমরসিংহ, বরাহমিহির, বেতালভট্ট, ঘটকর্পর, ধন্বন্তরি, ক্ষপণক ও শঙ্কু। এই শঙ্কুর নামের আগে প্রফেসর বানিয়ে তাকে নিয়ে গল্প ফেঁদেছিলেন কিনা সত্যজিৎ, সে কথা উনি লিপিবদ্ধ করে যান নি।

    তবে এই যে ন’টা মনুষ্যরত্ন, তাতেই নবরত্ন কথাটা সীমাবদ্ধ নয়। ন’টা রত্ন সত্যিই আছে। তাদের নাম হল মুক্তো, মানিক (এই রে, এটা আবার সত্যজিতের ডাকনাম), বৈদূর্য, গোমেদ, বজ্র, বিদ্রুম, পদ্মরাগ, মরকত এবং নীলকান্ত। বৈদূর্য কথাটার সাথে মহাভারতের বিদুর-এর যোগ আছে, কিন্তু একটা রত্নের সাথে গোমাংসের (গো-মেদ) কী সম্পর্ক? সেই যে মর্কট শিয়ালটা নীলের গামলায় পড়ে গিয়ে নীলবর্ণ হয়ে গেল, তা থেকেই কি মরকত আর নীলকান্ত?

    মা দুর্গাকে নবদুর্গারূপে অনেক জায়গাতেই পুজো করা হয়। সেই ন’টা রূপ হল পার্বতী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘন্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী ও সিদ্ধিদা। কুষ্মাণ্ডা কথাটার মধ্যে কুমড়ো আর ডিম লুকিয়ে আছে, চালকুমড়ো না মিষ্টিকুমড়ো কে জানে!

    দুর্গাপুজোর সময় গণেশের বউ শ্রীমতী কলাও পূজিতা হন। তাঁর আর এক নাম নবপত্রিকা। প্যাণ্ডেলে শুধু পাতা ও ধড়ওয়ালা কাটা কলাগাছ চোখে পড়ে, আসলে থাকা উচিত কলা, কচু, ধান, হলুদ, ডালিম, বেল, অশোক, জয়ন্তী ও মানকচু – এদের সবগুলোর পাতা দিয়ে তৈরী নারীমূর্তি। কচু ফচু বাংলাদেশের যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে, জয়ন্তীটা যে কী গাছ, জানি না। আপনারা জানেন?

    নয় নিয়ে সাতটা জিনিসের ন’টা করে সেট বলা হল। আট নম্বর হল নবদ্বার। আমাদের শরীরে ন’টা দরজা বা ছিদ্রপথ, সামলে রাখুন। এর মধ্যে দুটো চোখ, দুটো কান, দুটো নাসারন্ধ্র, বাকি তিনটে মুখ, পায়ু ও উপস্থ বা জননছিদ্র।

    নয় নিয়ে নয়নম্বর সেট – এখানেই দাঁড়ি টানব, বাংলা বা হিন্দী সিরিয়ালের মত টেনে লম্বা করব না – হল নবলক্ষণ। এরা হল ব্রাহ্মণ বা কুলীনের গুণ। এই লিস্টিতে আছে আচার, বিনয়, বিদ্যা, প্রতিষ্ঠা, তীর্থদর্শন, নিষ্ঠা, বৃত্তি, তপ ও দান। আপনাদের যাদের নামের শেষে –পাধ্যায় বা –র্জী আছে, মিলিয়ে নিন এর ক’টা গুণ আপনার মধ্যে বর্তমান। শর্ট পড়লে প্র্যাকটিশ করুন। চেষ্টা করলে কী না হয়!

    নয় নং একাশিটা (পরে অবশ্য জেনেছি ‘নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি’) জিনিসের নাম বললাম। মুখস্থ করে রাখুন। কখন কী কাজে লেগে যায়! তখন কিন্তু বলবেন না, যে বলিনি!

    বিজ্ঞানের ইতিহাস শিক্ষা

    বিজ্ঞানের ইতিহাস এক চমকপ্রদ বিষয়। বিজ্ঞান পাঠের সঙ্গে সঙ্গে তার ইতিহাস পাঠ আবশ্যিক হওয়া উচিত।

    নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আমাদের ছাত্রাবস্থায় এই ধারণা দেওয়া হয় যে বিজ্ঞান একটা ভয়ঙ্কর ধরনের গোলমেলে জিনিস, কেবলমাত্র মেধাবী ও তীব্র বুদ্ধিমান ছাত্রদের জন্যেই বিজ্ঞান। ফলে বিজ্ঞান নিয়ে সকলের মধ্যেই একটা ভীতি জন্মে যায়, এমনকি মেধাবী ও তীব্র বুদ্ধিমান ছাত্রও ভয়ে ভয়ে বিজ্ঞান পড়ে।

    অথচ বিজ্ঞানের ইতিহাস বেশ অন্য রকম। ইতিহাস বলে যাঁরাই বিজ্ঞানকে ফান বা মজা হিসাবে দেখেছেন, তাঁরাই নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করেছেন। যাঁরা ভীষণ সিরিয়াসলি আবিষ্কার করতে চেয়েছেন, তাঁদের অবদান বড়জোর মধ্যমশ্রেণির।

    আচার্য জগদীশচন্দ্র বিদেশে পড়াশুনা করে (লর্ড র‍্যালের মত নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ছিলেন তাঁর শিক্ষক) দেশে ফিরে প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক তো হলেন, কিন্তু যেই শুনলেন তাঁকে টু-থার্ড বেতন দেওয়া হবে কালা আদমি বলে, অমনি তা নিতে অস্বীকার করে পড়াতে লাগলেন। বিশ্বাস করুন, চাকরি জীবনের প্রথম দশ বচ্ছর তিনি গবেষণার ধারেকাছে যাননি। এডিসন ফোনোগ্রাম বানিয়েছে, তিনি তার একপিস সংগ্রহ করে বন্ধুবান্ধবদের ভয়েস রেকর্ড করে তাদের মজা দিতেন। ক্রুকস টিউব বা ক্যাথোড রে বানানোর টিউব জোগাড় করে ছাত্রদের ও অন্যান্যদের দেখাতেন। একটা ভালো ক্যামেরা জোগাড় করে বিভিন্ন জিনিসের ছবি তুলে বেড়াতেন। ছাত্রদের ক্লাশ নেওয়া ছাড়া ওটাই ছিল তাঁর প্রথম দশ বছরের কাজ। এর মধ্যে ফিজিক্সের রিসার্চ-টিসার্চ কিচ্ছু নেই।

    তারপর হঠাৎ একদিন মনে হল, ধুর, এসব ভাল্লাগছে না, একটু রিসার্চ করি। অমনি কদিনের চেষ্টাতেই আবিষ্কার করে ফেললেন তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করে বেতারে সিগন্যাল পাঠানোর কারিকুরি। কানাঘুষোয় জানা যায়, এর পেছনে স্ত্রী অবলা বসুর ধাতানিও ছিল – “কী তুমি বুদ্ধিমান মানুষ, গোরা লোকেরা কত কিছু আবিষ্কার করে, তুমি একটা কিছু তো করতে পারো” গোছের।

    প্রফুল্লচন্দ্র বিয়ে করেননি, তাঁকে ধাতানি দেওয়ার কেউ ছিল না। তবে তিনি নিজেই নিজেকে পুশ করতেন, তাই খুলে ফেললেন বেঙ্গল কেমিক্যালস। এডিনবরায় থাকতে শুনেছিলেন র‍্যামজে বলে লোকটা নাইট্রোজেনের অক্সাইড-টক্সাইড বানাচ্ছে। উনি মারকিউরাস নাইট্রাইট বানিয়ে ফেললেন। র‍্যামজের ভাগ্য ভালো, লর্ড র‍্যালের দয়ায় উনি ক্লু পেয়ে গেলেন নোবল গ্যাসের। ভেবে দেখুন, লর্ড র‍্যালের ছাত্র জগদীশচন্দ্র তখন ওখানে থাকলে হয়ত নোবেল গ্যাস উনিই আবিষ্কার করতেন। অথবা প্রফুল্লচন্দ্র।

    এই যে পারস্পরিক তথ্যের ও আইডিয়ার আদানপ্রদান, এর ফলেই সে সময় ইওরোপীয় ও পরে আমেরিকায় বিজ্ঞানের দ্রুত উন্নতি হয়েছে। আর ঠিক এর অভাবেই আমরা এখনও পিছিয়ে আছি। এবং বিজ্ঞান জিনিসটা ভয়ে ভয়ে পড়ি।

    অথচ আসলে এটা তো একটা মজার জিনিস। ছবি আঁকা বা নাচ-গান এর চেয়ে অনেক কঠিন।

    পরিবর্তন

    হৃদয় ছিল আমাজানের মত,
    সহস্রাধিক জাতের বৃক্ষ, লতা, গুল্মে ভরা,
    পশু, পাখি আর শ্বাপদের অভয়াচরণ।

    কামনার আগুনে জ্বলে গেছে সব,
    পড়ে আছে ছাই, কয়লা আর হাড়;
    হৃদয় এখন বিশাল সাহারা, গোবী।

    বিবরণ

    অদূরে পাহাড়; রঙের বাহার খেলিছে তাহার ’পর;
    নীলাভ সবুজ; মলিন সুরুজ; কুয়াশা বাঁধিছে ঘর।
    পাহাড়ের সারি গুনিতে না-পারি; গিয়েছে মিলিয়ে নভে;
    পাহাড়ের ছায়ে পাহাড় দাঁড়ায়ে; সবারই নজর লভে।
    নিকট অচলে রমণী-আদলে রয়েছে দাঁড়িয়ে একা
    একখানি তরু, যার তনু সরু; নারীরূপে তরুরেখা!
    এসবে ছাড়িয়ে রয়েছে দাঁড়িয়ে খুলিয়া রমণী চুল;
    পাহাড়শিখরে দেখিছে নিজেরে; পাশে ফুটে আছে ফুল।
    ঢেউ-খেলা চুল করিছে ব্যাকুল পড়িয়া সোনালি আলো—
    এপাশে বাদামি রঙেরে প্রণামি; ওপাশে তিমির কালো।
    কবির চরণে চুলের বরণে রচা ‘বিদিশার নিশা’
    তারাধাঁর কেশে মেদুর আবেশে যেন পেয়ে গেছে দিশা!
    ক্ষণিকের তরে আঁখি বন্ধ্ করে হৃদয়ে পুরিতে সুখ,
    দূর দিকপানে পাহাড়ের শানে ফিরিয়া লইয়া মুখ
    তুলিলে দারুণ, যা দেখে অরুণ নিজেই জ্বলিবে খোদ,
    একখানি ছবি, যাহা দেখে কবি হারাবে আপন বোধ—
    যেরূপ ছবিতে নজরে চকিতে ভরিয়া যাইবে আঁখি;
    রহিবে ভুলিয়া নয়ন খুলিয়া তাবৎ ধরণি বাকি!

    চিত্রাধার: কার্শিয়ং, দার্জিলিং, ভারত।

    উ-কার ও ঊ-কারের ব্যবহার

    বাংলা বর্ণমালায় হ্রস্ব-উ ও দীর্ঘ-ঊ থাকলেও (যেমন কুল, কূল, দুর, দূর) উচ্চারণে এদের হ্রস্বতা বা দীর্ঘতা সংস্কৃতের মতো, যথাযথ রক্ষিত হয় না। এ জন্য উ-কার ও ঊ-কারজনিত বানান বিভ্রাট হয়ে থাকে। তবে কিছু নিয়ম জেনে রাখলে এ সংক্রান্ত বাধা অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

    ১। বানানে উ-ধ্বনিতে কেবল উ-কার

    ১.১। দ্বিরাবৃত্ত শব্দের উ-ধ্বনিতে সর্বত্রই উ-কার যেমন— কাটাকুটি, খুনোখুনি, খোলাখুলি, জোরাজুরি, পুরোপুরি, কোনাকুনি, ঝুলোঝুলি, খোঁজাখুঁজি।

    ১.২। বিদেশাগত শব্দের উ- ধ্বনিতে সর্বত্রই উ- কার; যেমন— কবুল, কানুন, হুকুম, খুন, খুব, বুনিয়াদ, মজুর, কুত্তা, গুণ্ডা, মুদি, কুকার, ডেপুটি, পুলিশ, স্কুল, কার্তুজ, কুপন, কুলি, লুচি, লুঙ্গি, চুক্তি, পুঁতি, হুন্ডি, সুইচ।

    ১.৩। তদ্ভব ও দেশজ শব্দের উ-ধ্বনিতে সর্বত্র উ-কার; যেমন— কুলো, ঘুড়ি, নতুন, পুবালি, কুয়ো, তুলো, পুজো, মুলো, সুতো, ধুলো, রুপো, ফুর্তি।

    লক্ষণীয় যে তদ্ভব শব্দে উ-কার হলেও তৎসম শব্দে যথারীতি ঊ- কার হয়ে থাকে, যেমন— নূতন, ধূলি, পূজা, পূর্ব, মূলা, রূপ, সূত্র, স্ফূর্তি । অর্থাৎ ধূলি থেকে ধুলো। পূজা থেকে পুজো। মূলা থেকে মুলো।

    ১.৪। ক্রিয়াবাচক শব্দ ও ক্রিয়ারূপের উ- ধ্বনিতে সর্বত্র উ- কার ( ক্রিয়াবাচক শব্দ); যেমন— উড়া, ছুটা, বুঝা, উপড়ানো, মুচড়ানো, খুঁজা, ঢুকা, ঘুমানো, পুড়া, জুড়ানো, শুকানো।

    ক্রিয়ার রূপ : আসুন, বসুন, করুন, তুলুন, ভাবুন, আসুক, বসুক, তুলুক, ভাবুক।

    ২. শব্দের শেষ বর্ণে উ-কার ও ঊ-কার

    বাংলা ভাষার কয়েকটিমাত্র তৎসম শব্দের শেষ বর্ণে ঊ- কার হয়। যেমন— প্রতিভূ, শ্বশ্রূ, স্বয়ম্ভূ, কদ্রূ, চম্পূ, মরুভূ, প্রসূ, খলপূ, চমূ। এখন এদের কয়েকটির ব্যবহার নাই। অন্যদিকে কোনো কোনোটি পরপদ হিসেবে আরও কিছু সমাসবদ্ধ শব্দ তৈরি করে। যেমন— ফলপ্রসূ, স্বর্ণপ্রসূ, বীরপ্রসূ, ক্রিয়াপ্রসূ।

    স্কন্দপুরাণ – সার্ধ সহস্রাব্দের বিবর্তন : পঞ্চম পর্ব

    স্কন্দপুরাণের রচনাকাল

    চারটি প্রাচীন নেপালি পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতে সমীক্ষাত্মক সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার পর এখন আধুনিক বিদ্বানরা এই রূপটিই যে স্কন্দপুরাণের আদিরূপের সবচেয়ে নিকটবর্তী রূপ এ বিষয়ে নিঃসন্দেহ। স্কন্দপুরাণের সমীক্ষাত্মক সংস্করণের সঙ্গে যুক্ত বিদ্বানরা মনে করেন এই আদিরূপের রচনার কালপর্ব ৫৭০ থেকে ৬২০ সাধারণ অব্দের মধ্যবর্তী সময়। আদিরূপের রচনার সূত্রপাত কন্নৌজের মৌখরী শাসক শর্ববর্মন বা অবন্তীবর্মনের আমলে আর সমাপ্ত হয় হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে। এই আদিরূপটির একটি স্বল্প বিবর্তিত রূপ ৬৭০-৭০০ সাধারণ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে এবং আরও কিছুটা বিবর্তিত একটি রূপ ৭৭০-৮০০ সাধারণ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে উত্তর ভারত থেকে নেপালে পৌঁছায়।[১]

    স্কন্দপুরাণের সমীক্ষাত্মক সংস্করণের দ্বিতীয় অধ্যায়ে (২.৩-২৯) প্রদত্ত অনুক্রমণিকার সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে গ্রন্থটিতে বর্ণিত বিষয়সমূহ ও বর্ণনার ক্রমের পার্থক্য আছে। সম্ভবত অনুক্রমণিকা অংশটি স্কন্দপুরাণের আরও প্রাচীন কোনও রূপ থেকে অপরিবর্তিত অবস্থায় নেপালি পাণ্ডুলিপিগুলিতে স্থান লাভ করেছে। অনুক্রমণিকায় উল্লিখিত বিষয়সূচি থেকে বোঝা যায়, প্রথম থেকেই স্কন্দপুরাণ রচনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের, বিশেষত উত্তর ও পশ্চিম ভারতের তৎকালীন জনপ্রিয় শৈব তীর্থগুলির সঙ্গে যুক্ত পৌরাণিক কাহিনিসমূহের বর্ণনার মাধ্যমে শৈব ধর্ম ও শৈবতীর্থগুলির মহিমামণ্ডন। এই তীর্থক্ষেত্রগুলির মধ্যে অবশ্য স্কন্দপুরাণে সবচেয়ে গুরুত্ব লাভ করেছে বারাণসী। এই গ্রন্থের ২৬-৩১ অধ্যায়ে বারাণসীর যে মাহাত্ম্য কাহিনি বর্ণিত হয়েছে, তা অত্যন্ত প্রাচীন এবং এখানে বর্ণিত পুরাকথার কিছু অংশ পরবর্তী কালে মত্স্যপুরাণে উল্লিখিত হয়েছে। এই অংশে বর্ণিত যক্ষ পূর্ণভদ্রের পুত্র যক্ষ পিঙ্গল বা হরিকেশকে শিব কর্তৃক বারাণসীর ক্ষেত্রপাল নিয়োগের কাহিনির এক বিস্তারিত রূপ পরবর্তী কালে স্কন্দপুরাণের ৭ খণ্ডের রূপের কাশীখণ্ডে (পুর্বার্ধ।৩২) দেখতে পাওয়া যায়। এই গ্রন্থের ৩২তম অধ্যায়ে বর্ণিত দক্ষযজ্ঞের কাহিনিতে উল্লিখিত কয়েকটি ঘটনা অন্য কোনও বিদ্যমান গ্রন্থে দেখা যায় না। স্কন্দপুরাণের সমীক্ষাত্মক সংস্করণের ৩৭-৫০ অধ্যায়ে ১৩টি নরকের বর্ণনা আছে। এই বর্ণনার সঙ্গে বিদ্যমান ব্রাহ্মণ্য গ্রন্থসমূহের পার্থক্য ও সাধারণ অব্দের প্রথম কয়েক শতকে রচিত বৌদ্ধ গ্রন্থসমূহের বর্ণনার মিল লক্ষণীয়। অন্ধকাসুর বধের কাহিনি এই গ্রন্থের এক বিশাল অংশ (৭৩-১১২ অধ্যায় ও ১৩০-১৫৭) অধ্যায় জুড়ে ব্যাপ্ত। এই পুরাণ গ্রন্থে বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতার ও বরাহ অবতারের কাহিনি শৈব ভাবনা থেকে বর্ণিত হয়েছে, তাই অবতার শব্দের পরিবর্তে রূপ, বপু প্রভৃতি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এই গ্রন্থে স্কন্দ অর্থাৎ কার্তিকেয় দেবের জন্ম থেকে তারকাসুর বধ পর্যন্ত কাহিনির বিস্তারিত উল্লেখের কারণে যে গ্রন্থটিকে স্কন্দপুরাণ নামকরণ করা হয়েছে তাও বোঝা যায়।

    গুপ্ত সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ার পর ষষ্ঠ শতক সাধারণ অব্দের প্রথম দিকে মগধের (গয়া ও পার্শ্ববর্তী এলাকার) মৌখরী বংশীয়রা এবং এর কয়েক দশক বাদে কান্যকুব্জের (কন্নৌজ) মৌখরী বংশীয়রা বর্তমান বিহার ও উত্তর প্রদেশে নিজেদের আধিপত্য স্থাপন করেন। ষষ্ঠ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকার উপর কান্যকুব্জের মৌখরীদের রাজত্ব বিস্তৃত হয়। কিন্তু ষষ্ঠ শতকের শেষ দিকে মৌখরী রাজত্বের পূর্ব দিকের কিছু অংশ পরবর্তী গুপ্তবংশীয় বলে অভিহিত শাসকদের অধিকারে চলে যায়। ষষ্ঠ শতকের শেষে বা সপ্তম শতকের শুরুতে পরবর্তী গুপ্তবংশীয়দের অধীনস্থ এক সামন্ত শাসক শশাঙ্ক গৌড়ের স্বাধীন শাসক হিসাবে রাজত্ব করতে শুরু করেন।ষষ্ঠ শতকের শেষার্ধে মৌখরী বংশীয়দের রাজত্বের পশ্চিম দিকের এলাকায় থানেশ্বরের পুষ্যভূতি বংশীয়দের উত্থান ঘটে। সপ্তম শতকের শুরুতে পুষ্যভূতি বংশীয় শাসক হর্ষবর্ধনের আমলে মৌখরীরা তাঁর সামন্ত শাসকে পরিণত হন, শশাঙ্ক পরাভূত হন, কার্যত সমস্ত উত্তর ভারত হর্ষবর্ধনের অধীনে চলে আসে। গুপ্ত বংশীয় শাসকরা বৈষ্ণব মতাবলম্বী ছিলেন, তাঁদের রাজত্বকালে উত্তর ভারতে বৈষ্ণব ধর্ম ব্যাপকতা লাভ করে। সাংখ্য দর্শন প্রভাবিত পাঞ্চরাত্র দর্শনের জনপ্রিয়তা উত্তর ভারতে বৃদ্ধি পায়। রামায়ণের রাম এবং মহাভারত ও হরিবংশের কৃষ্ণের বিষ্ণুর সঙ্গে একাত্মকরণ চূড়ান্ত রূপ গ্রহণ করে। প্রাচীন বৈষ্ণব পুরাণ গ্রন্থ বিষ্ণুপুরাণও সম্ভবত গুপ্ত আমলের রচনা। গুপ্ত সাম্রাজ্যের অবসানের পর উত্তর ও পূর্ব ভারতে শৈব ধর্মের উত্থান ঘটে। শৈব পাশুপত সন্ন্যাসীদের সাংখ্য দর্শন প্রভাবিত পাশুপত দর্শনের ভাবনা উত্তর ও পূর্ব ভারত থেকে শুরু করে নেপাল পর্যন্ত ব্যাপ্ত হয়। মৌখরী বংশীয় শর্ববর্মন ও অবন্তীবর্মন শৈব ছিলেন, শশাঙ্কও শৈব ছিলেন। হর্ষবর্ধনও শৈব ছিলেন। এই কালপর্বে মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম শৈব ধর্মীয় বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত হয়। শৈব ধর্মের এই উত্থানের যুগে শৈব ধর্ম বা বিশেষ করে পাশুপত মতাবলম্বীদের তীর্থস্থলগুলিকে জনপ্রিয় করে তোলার উদ্দেশ্য নিয়ে স্কন্দপুরাণের আদি রূপের রচনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে মনে হয়। এর পাশাপাশি নতুন জনপ্রিয় শৈব ধর্মকে বর্ণাশ্রমধর্মের সঙ্গে যুক্ত করাও স্কন্দপুরাণের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে হয়।

    স্কন্দপুরাণের বিবর্তন

    অম্বিকা খণ্ড ও রেবা খণ্ড গ্রন্থদ্বয়ের পাণ্ডুলিপির বিষয়ে আগেই উল্লেখ করেছি। এশিয়াটিক সোসাইটি গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত এই দুটি গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যে মন্তব্য করেছিলেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, রেবা খণ্ডের এই পাণ্ডুলিপিটি বেঙ্কটেশ্বর প্রেস সংস্করণের স্কন্দপুরাণের রেবা খণ্ড থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। তিনি এই পাণ্ডুলিপির বিষয়বস্তু, অধ্যায়গুলির বিন্যাস ও অধ্যায়গুলির নামের সঙ্গে তাঁর নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থাগারে আবিষ্কৃত স্কন্দপুরাণের প্রাচীন পাণ্ডুলিপির সঙ্গে এত বেশি মিল খুঁজে পান যে এই রেবা খণ্ড গ্রন্থটিকে ঐ স্কন্দপুরাণেরই একটি রূপ বলে অভিহিত করেন। তিনি অম্বিকা খণ্ডের দুটি পাণ্ডুলিপির সঙ্গেও স্কন্দপুরাণের প্রাচীন পাণ্ডুলিপির প্রচুর মিল খুঁজে পান। তাঁর মনে হয়েছিল, স্কন্দপুরাণের প্রাচীন পাণ্ডুলিপির সঙ্গে এই দুই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপির গভীরভাবে তুলনা করলে স্কন্দপুরাণের বিভিন্ন অংশে বিভাজন সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে।[২]

    হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর দিশানির্দেশ অনুসরণ করে কোনও আধুনিক বিদ্বানকে স্কন্দপুরাণের বিবর্তন নিয়ে গবেষণা করতে দেখা যায়নি। দীর্ঘদিন বাদে কৃষ্ণপ্রসাদ ভট্টরাই তাঁর ১৯৮৮ সালে সম্পাদিত ‘স্কন্দপুরাণস্য অম্বিকাখণ্ড’ গ্রন্থটির জন্য নেপালের প্রাচীন তিনটি স্কন্দপুরাণের পাণ্ডুলিপির সাথে সাথে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে সংরক্ষিত দেবনাগরী লিপিতে লেখা পাণ্ডুলিপিটি ব্যবহার করেন। এরপর স্কন্দপুরাণের সমীক্ষাত্মক সংস্করণের সম্পাদকরা রেবা খণ্ডের পাণ্ডুলিপি ও অম্বিকা খণ্ডের পাণ্ডুলিপিসমূহ অধ্যয়ন করে নিঃসন্দেহ হন, এই দুটি গ্রন্থ প্রাচীন স্কন্দপুরাণেরই পরবর্তীকালের কিছুটা বিবর্তিত রূপ। তাই স্কন্দপুরাণের সমীক্ষাত্মক সংস্করণের প্রস্তুতির জন্য তাঁরা স্কন্দপুরাণের চারটি প্রাচীন নেপালি পাণ্ডুলিপির সাথে রেবা খণ্ডের পাণ্ডুলিপি ও অম্বিকা খণ্ডের ৭টি পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করছেন। সমস্ত পাণ্ডুলিপির প্রথম থেকে ১৬২তম অধ্যায় পর্যন্ত পাঠ প্রায় একই রকম, কিন্তু পরবর্তী অংশে স্কন্দপুরাণের প্রাচীন নেপালি পাণ্ডুলিপিগুলির সঙ্গে রেবা খণ্ডের পাণ্ডুলিপি ও অম্বিকা খণ্ডের পাণ্ডুলিপিগুলির যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

    স্কন্দপুরাণের সমীক্ষাত্মক সংস্করণের সঙ্গে যুক্ত বিদ্বানরা এই পাণ্ডুলিপিসমূহ ও মধ্যযুগের স্মৃতিনিবন্ধ গ্রন্থগুলিতে উদ্ধৃত স্কন্দপুরাণের শ্লোকগুলির তুলনামূলক অধ্যয়ন করে স্কন্দপুরাণের বিবর্তনের ধারা সম্পর্কে মোটামুটিভাবে একটি ধারণা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। স্কন্দপুরাণের আদি রূপে কোনও খণ্ডের বিভাজন ছিল না। তাই যে নিবন্ধকাররা এই অখণ্ড রূপটি উদ্ধৃত করেছেন তাঁরা কোনও খণ্ডের উল্লেখ করেননি। অনুমান করা হয়েছে, দ্বাদশ শতক সাধারণ অব্দের পূর্ববর্তী কোনও সময়ে (খুব সম্ভবত নবম শতক সাধারণ অব্দে) স্কন্দপুরাণের এই অখণ্ড রূপের এক বড় রকমের পরিবর্তন করা হয়। এই পরিবর্তনের ফলে ১৬২তম অধ্যায়ের পূর্ববর্তী কিছু অধ্যায় বাদ যায়, আর ১৬২তম অধ্যায়ের পরবর্তী অংশ আকারে বৃদ্ধি পায়। এই পরিবর্তন সম্ভবত পূর্ব ভারতের কোথাও করা হয়েছিল।

    ভট্ট লক্ষ্মীধর কন্নৌজের গাহড়বাল বংশীয় শাসক গোবিন্দচন্দ্রের সান্ধিবিগ্রহিক (যুদ্ধমন্ত্রী) ছিলেন। দ্বাদশ শতক সাধারণ অব্দের প্রথমার্ধে তিনি তাঁর কৃত্যকল্পতরু নামের ধর্মনিবন্ধ গ্রন্থের ১৪টি কাণ্ড রচনা করেছিলেন। তিনি তাঁর গ্রন্থে স্কন্দপুরাণের কোনও খণ্ড বিভাজনের কথা উল্লেখ করেননি। কৃত্যকল্পতরু গ্রন্থের নিয়তকালকাণ্ড অংশে স্কন্দপুরাণ থেকে এক দীর্ঘ উদ্ধৃতি রয়েছে। এই উদ্ধৃত শ্লোকগুলি প্রাচীন নেপালি পাণ্ডুলিপিতে নেই, কিন্তু অম্বিকা খণ্ড ও রেবা খণ্ডের পাণ্ডুলিপিতে পাওয়া যায়। আবার কৃত্যকল্পতরু গ্রন্থের ব্রতকাণ্ড ও রাজধর্মকাণ্ড অংশে উদ্ধৃত শ্লোকগুলি প্রাচীন নেপালি পাণ্ডুলিপিতে বিদ্যমান।[৩] এর ভিত্তিতে অনুমান করা হয়েছে, দ্বাদশ শতকের প্রথমার্ধে ভট্ট লক্ষ্মীধর স্কন্দপুরাণের যে পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেছেন, তা নেপালি পাণ্ডুলিপির বৃহৎ পরিবর্তনের পরবর্তী এবং অম্বিকা খণ্ড ও রেবা খণ্ড উভয়েরই নিকট পূর্বসূরি কোনও পাণ্ডুলিপি।[৪] কৃত্যকল্পতরু গ্রন্থের তীর্থবিবেচনকাণ্ড অংশেও স্কন্দপুরাণ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। এই উদ্ধৃত অংশের সঙ্গে রেবা খণ্ডের মিল বেশি।[৫] দ্বাদশ শতক সাধারণ অব্দের দ্বিতীয়ার্ধে, ১০৯১ শকাব্দে অর্থাৎ ১১৬৮ বা ১১৬৯ সাধারণ অব্দে বল্লালসেন তাঁর দানসাগর গ্রন্থ রচনা করেন। এখানে তিনি (উপক্রমণিকা।৬২) স্কন্দপুরাণের তিনটি খণ্ডের কথা উল্লেখ করেছেন – পৌণ্ড্র, রেবা ও অবন্তী খণ্ড, কিন্তু তিনি অপ্রামাণিক বলে এই খণ্ড তিনটি ব্যবহার করেননি।দানসাগর গ্রন্থে তিনি স্কন্দপুরাণের কোনও একটি অখণ্ড সংস্করণের পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধৃত করেছেন এবং এই পাণ্ডুলিপিটি অম্বিকা খণ্ড ও রেবা খণ্ড উভয়েরই পূর্বসূরি কোনও পাণ্ডুলিপি। বল্লালসেন তাঁর অদ্ভুতসাগর গ্রন্থে স্কন্দপুরাণের একটি শ্লোকার্ধ উদ্ধৃত করেছেন। এই শ্লোকার্ধটি অম্বিকা খণ্ড ও রেবা খণ্ড উভয় গ্রন্থের পাণ্ডুলিপিতেই পাওয়া যায়।[৬] চণ্ডেশ্বর ঠক্কুর মিথিলার কর্ণাট রাজবংশের শাসক হরিসিংহদেবের সান্ধিবিগ্রহিক ছিলেন। চতুর্দশ শতক সাধারণ অব্দের প্রথম দিকে তিনি ৭টি অংশে বিভক্ত ধর্মনিবন্ধ গ্রন্থ স্মৃতিরত্নাকর রচনা করেছিলেন। এই গ্রন্থের কৃত্যরত্নাকর অংশে স্কন্দপুরাণের কোনও অখণ্ড সংস্করণের পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে এবং লক্ষ্মীধর উদ্ধৃত করেননি অথচ নেপালি পাণ্ডুলিপিতে আছে এমন শ্লোক চণ্ডেশ্বরকে উদ্ধৃত করতে দেখা গিয়েছে। সম্ভবত লক্ষ্মীধর ও চণ্ডেশ্বর অম্বিকা খণ্ড ও রেবা খণ্ডের পূর্বসূরি কোনও একই পাঠযুক্ত পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেছেন।[৭] ষোড়শ শতক সাধারণ অব্দে রঘুনন্দন ভট্টাচার্য ২৮টি অংশ বিশিষ্ট তাঁর স্মৃতিতত্ত্ব গ্রন্থের আহ্নিকতত্ত্ব, মলমাসতত্ত্ব ও একাদশীতত্ত্ব অংশে কাশী খণ্ড থেকে, তিথিতত্ত্ব ও শ্রাদ্ধতত্ত্ব অংশে নাগর খণ্ড থেকে এবং তিথিতত্ত্ব, মলমাসতত্ত্ব ও শ্রাদ্ধতত্ত্ব অংশে প্রভাস খণ্ড থেকে শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন।[৮] এই সময় কয়েকটি খণ্ডে বিভক্ত স্কন্দপুরাণই ধর্মনিবন্ধকারদের কাছে বেশি পরিচিত ছিল, বুঝতে অসুবিধা হয় না।

    এ কথা অনুমান করলে ভুল হবে না, দ্বাদশ শতক সাধারণ অব্দের শেষার্ধেই স্কন্দপুরাণের খণ্ডে বিভাজন ও সম্প্রসারণ শুরু হয়ে গিয়েছিল কিন্তু চতুর্দশ শতক সাধারণ অব্দ পর্যন্ত স্মৃতিনিবন্ধকাররা পুরোনো অখণ্ড সংস্করণকেই প্রকৃত স্কন্দপুরাণ বলে জানতেন। কিন্তু তারপর ধর্মনিবন্ধকাররা নতুন খণ্ডাত্মক সংস্করণকে প্রকৃত স্কন্দপুরাণ বলে ব্যবহার করতে শুরু করলেন, পুরোনো সংস্করণটির পাণ্ডুলিপির লিপিকররা একে রেবা খণ্ড ও অম্বিকা খণ্ড নামে পুষ্পিকায় অভিহিত করতে শুরু করলেন। সম্ভবত তাঁরাও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, পুরোনো পাণ্ডুলিপির পুষ্পিকায় কেবল স্কন্দপুরাণ বলে উল্লেখ থাকলেও গ্রন্থটি সম্ভবত স্কন্দপুরাণের তাঁদের অজ্ঞাত কোনও একটি খণ্ড। এমনই করে ধীরে ধীরে লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে গেল সার্ধ সহস্রাব্দ প্রাচীন অখণ্ড সংক্ষিপ্ত স্কন্দপুরাণ, তার স্থান গ্রহণ করল নবীন ৭টি খণ্ডে বিভক্ত বিশাল স্কন্দপুরাণ। আজ এই বিবর্তনের ইতিহাসের উপর থেকে যবনিকা একটু একটু করে উত্তোলিত হচ্ছে। কীভাবে স্কন্দপুরাণের এই বিশাল বিবর্তন ঘটেছিল, সেই বিষয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। প্রাচীন স্কন্দপুরাণে বর্ণিত পুরাকথার সঙ্গে নবীন স্কন্দপুরাণে তার বিবর্তিত রূপের তুলনামূলক গবেষণার ফলে অন্ত-মধ্যযুগের ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্ম ভাবনার বিবর্তন সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য জানা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

    (সমাপ্ত)

    তথ্যসূত্র:

    1. Hans T. Bakker, ‘Origin and Growth of the Purāṇic Text Corpus, With Special Reference to the Skandapurāṇa’; Delhi: Motilal Banarsidass, 2004.
    2. Hans T. Bakker, ‘The World of the Skandapurāṇa: Northern India in the Sixth and Seventh Centuries’; Leiden: Brill, 2014.
    3. Peter C. Bisschop, ‘Early Śaivism and the Skandapurāṇa: Sects and Centres’; Groningen: Egbert Forsten, 2006.
    4. R. Adriaensen, H.T. Bakker, and H. Isaacson, “Towards A Critical Edition of the Skandapurāṇa” in ‘Indo-Iranian Journal, Vol. 37, Issue 4 (Jan 1994)’; Brill, 1994, pp. 325—331.

    স্কন্দপুরাণ – সার্ধ সহস্রাব্দের বিবর্তন : চতুর্থ পর্ব

    স্কন্দপুরাণের আরও রূপ

    স্কন্দপুরাণের অংশ বলে উল্লিখিত বেশ কয়েকটি গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি বিভিন্ন গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখনীয় অম্বিকা খণ্ড ও রেবা খণ্ড নামের দুটি গ্রন্থ। অম্বিকা খণ্ডের এখনও পর্যন্ত ৭টি কাগজের পাণ্ডুলিপির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এই পাণ্ডুলিপিগুলির মধ্যে রয়েছে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে সংরক্ষিত দেবনাগরী ও বাংলা লিপিতে লেখা দুটি তারিখবিহীন পাণ্ডুলিপি[১], বর্তমানে লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত দেবনাগরী লিপিতে লেখা একটি তারিখবিহীন পাণ্ডুলিপি[২], বারাণসীর সংস্কৃত কলেজে সংরক্ষিত দেবনাগরী লিপিতে লেখা একটি তারিখবিহীন পাণ্ডুলিপি,[৩] কলকাতার সংস্কৃত কলেজে সংরক্ষিত ১৯৫৫ বিক্রম সংবতে (১৮৯৮ বা ১৮৯৯ সাধারণ অব্দে) দেবনাগরী লিপিতে লিপিবদ্ধ একটি পাণ্ডুলিপি[৪], ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত বাংলা লিপিতে লেখা একটি তারিখবিহীন পাণ্ডুলিপি এবং যোধপুরের মহারাজা মানসিংহ পুস্তক প্রকাশ গ্রন্থগারে সংরক্ষিত ১৮৭৭ বিক্রম সংবতে (১৮১৯ বা ১৮২০ সাধারণ অব্দে) দেবনাগরী লিপিতে লিপিবদ্ধ একটি পাণ্ডুলিপি। বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও শহরে ১৬৮২ সাধারণ অব্দে লিপিবদ্ধ বাংলা লিপিতে লেখা রেবা খণ্ডের একটি মাত্র কাগজের পাণ্ডুলিপি কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে সংরক্ষিত আছে।[৫] এই রেবা খণ্ড গ্রন্থটি আবন্ত্য খণ্ডের অন্তর্ভুক্ত রেবা খণ্ডের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। এই দুটি গ্রন্থের আসল পরিচিতি সম্পর্কে পরে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

    এই দুটি গ্রন্থ ছাড়া তাপী খণ্ড (বা তাপী মাহাত্ম্য), ভীমা খণ্ড, পর্বত খণ্ড, অযোধ্যা খণ্ড, মথুরা খণ্ড, পাতাল খণ্ড, নির্বাণ খণ্ড, উমা খণ্ড, পরশুরাম খণ্ড, ভূ খণ্ড প্রমুখ এমন কয়েকটি গ্রন্থের পাণ্ডুলিপির সন্ধান পাওয়া যায়, যে গ্রন্থগুলির পুষ্পিকায় স্কন্দ পুরাণের অংশ বলে উল্লিখিত হয়েছে। মহাবালেশ্বর মাহাত্ম্য, শ্রীমাল মাহাত্ম্য (বা শ্রীমাল খণ্ড), বিশ্বামিত্রী মাহাত্ম্য, সিংহাচলক্ষেত্র মাহাত্ম্য, বিরজা মাহাত্ম্য সমেত বেশ কয়েকটি মাহাত্ম্য পর্যায়ের গ্রন্থের পাণ্ডুলিপিতে গ্রন্থগুলিকে স্কন্দপুরাণের অংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। করতোয়া মাহাত্ম্য গ্রন্থটির ১৮৬২ সালে লিপিবদ্ধ একটি পাণ্ডুলিপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। ১৮৯১ সালে এই গ্রন্থটি রাজচন্দ্র ন্যায়পঞ্চাননের বাংলা অনুবাদ সমেত প্রথম প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯২৯ সালে প্রভাস চন্দ্র সেনের লেখা ‘মহাস্থান অ্যান্ড ইটস এনভায়রনস’ গ্রন্থের পরিশিষ্ট হিসাবে আবার প্রকাশিত হয়। ৮৫টি শ্লোক বিশিষ্ট করতোয়া মাহাত্ম্যের পুষ্পিকায় গ্রন্থটিকে উত্তর পৌণ্ড্র খণ্ডের অংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।[৬] কার্তিকেয় ব্রতকথা, উপাঙ্গললিত ব্রতকথা, অনন্ত ব্রতকথা, বটসাবিত্রী ব্রত বা অদুঃখনবমী ব্রত গ্রন্থের মতো কয়েকটি ব্রত বা ব্রতকথা নামে অভিহিত গ্রন্থের পুষ্পিকাতেও গ্রন্থগুলিকে স্কন্দপুরাণের অংশ বলে উল্লিখিত হয়েছে। মাহাত্ম্য বা ব্রতকথা নামে অভিহিত এই গ্রন্থসমূহ বা তাদের কোনও প্রাচীনতর রূপ বিগত সহস্রাব্দের কোনও সময় স্কন্দপুরাণের কোনও রূপের অঙ্গীভূত ছিল কিনা আজ বলা কঠিন।

    নেপালের প্রাচীন পাণ্ডুলিপিসমূহ

    উনিশ শতকের শেষে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর নেপালে স্কন্দপুরাণের একটি প্রাচীন পাণ্ডুলিপির আবিষ্কার প্রথম ইঙ্গিত করে স্কন্দপুরাণের ৭টি খণ্ড বা ৬টি সংহিতা বিশিষ্ট রূপের সূত্রপাত সম্ভবত অন্ত-মধ্যযুগে। ১৮৯৮-১৮৯৯ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কাঠমান্ডুতে নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থাগারে বেশ কিছু সংখ্যক তালপাতার সংস্কৃত পাণ্ডুলিপির সন্ধান পান। এরই মধ্যে একটি পুথি স্কন্দপুরাণের এখনও পর্যন্ত জ্ঞাত সর্বপ্রাচীন পাণ্ডুলিপি। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর প্রতিবেদনে এই পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, স্কন্দপুরাণের এই পাণ্ডুলিপির কোনও পুষ্পিকাতেই কোনও খণ্ডের নামের উল্লেখ নেই। এর ভিত্তিতে তিনি অনুমান করেন স্কন্দপুরাণের বহুসংখ্যক খণ্ড ও মাহাত্ম্যে বিভাজন এক ক্রমিক বিবর্তন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও সংস্কৃত বিদ্বান সেসিল বেন্ডাল পাণ্ডুলিপির লিপির গড়ন বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, স্কন্দপুরাণের এই পাণ্ডুলিপিটি পরমেশ্বরতন্ত্র গ্রন্থের ৮৫৯ সাধারণ অব্দে লিপিবদ্ধ একটি পাণ্ডুলিপির অন্তত দুই শতাব্দী আগে লেখা, অতএব ৬৫৯ সাধারণ অব্দ বা তার পূর্বে লিপিবদ্ধ।[৭] এখানে উল্লেখ্য হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও সেসিল বেন্ডাল পরমেশ্বরতন্ত্র গ্রন্থের পাণ্ডুলিপির তারিখ হর্ষ সংবতের ২৫২ সন ধরে এই গণনা করেছিলেন। কিন্তু আসলে এই পাণ্ডুলিপির তারিখ মানদেব (অর্থাৎ অংশুবর্মন) সংবতের ২৫২ সন, অর্থাৎ ৮২৯ সাধারণ অব্দ।

    হরপ্রসাদ শাস্ত্রী উল্লিখিত স্কন্দপুরাণের এই তালপত্রের পাণ্ডুলিপিটি (সংগ্রহ সংখ্যা ২-২২৯) বর্তমানে নেপালের কাঠমান্ডুতে অবস্থিত রাষ্ট্রীয় অভিলেখালয়ে সংরক্ষিত আছে। পরবর্তী কালে এই পাণ্ডুলিপিটির পুষ্পিকায় সমাপ্তির তারিখ কোনও অজ্ঞাত পঞ্জিকার ২৩৪ সনের চৈত্র মাসের শুক্লা দ্বাদশী বলে উল্লেখ খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। এই অজ্ঞাত পঞ্জিকাটি মানদেব (অর্থাৎ অংশুবর্মন) সংবত ধরে নিয়ে এই পাণ্ডুলিপিটি ৮১১ (বা ৮১০) সাধারণ অব্দে লিখিত বলে আধুনিক বিদ্বানরা মনে করেন।[৮] এই পুথিটিই এখনও পর্যন্ত নেপালে প্রাপ্ত তারিখযুক্ত সংস্কৃত পাণ্ডুলিপির মধ্যে প্রাচীনতম। পরবর্তী কালে সংগৃহীত স্কন্দপুরাণের আরও দু’টি তালপত্রের গুপ্তোত্তর বা লিচ্ছবি লিপিতে লেখা প্রাচীন তারিখবিহীন পাণ্ডুলিপি (সংগ্রহ সংখ্যা ১-৮৩১ এবং ৪-২২৬০) বর্তমানে রাষ্ট্রীয় অভিলেখালয়ে সংরক্ষিত রয়েছে। আধুনিক বিদ্বানরা লিপির বিশ্লেষণ করে এই দু’টি পাণ্ডুলিপিটিও প্রায় সমান প্রাচীন বলে উল্লেখ করেছেন। কৃষ্ণপ্রসাদ ভট্টরাই তাঁর ১৯৮৮ সালে সম্পাদিত ‘স্কন্দপুরাণস্য অম্বিকাখণ্ড’ গ্রন্থটির জন্য স্কন্দপুরাণের এই তিনটি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেন। স্কন্দপুরাণের সমীক্ষাত্মক সংস্করণের জন্য এই তিনটি পাণ্ডুলিপির সাথে অক্সফোর্ডের বোদলেইয়ান লাইব্রেরিতে ১৯৯২ সালে সংগৃহীত আর একটি তালপত্রের গুপ্তোত্তর বা লিচ্ছবি লিপিতে লেখা প্রাচীন পাণ্ডুলিপি (সংগ্রহ সংখ্যা স্যাংস্ক.এ.১৪ (আর)) ব্যবহৃত হয়েছে। বোদলেইয়ান লাইব্রেরির স্যাংস্ক.এ.১৪ (আর) সংখ্যক পাণ্ডুলিপি ও কাঠমান্ডুর রাষ্ট্রীয় অভিলেখালয়ে সংরক্ষিত ৪-২২৬০ সংখ্যক পাণ্ডুলিপি একই মূল পাণ্ডুলিপির দুটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অংশ।

    [ক্রমশঃ]

    তথ্যসূত্র:

    1. Heinrich von Stietencron, Angelika Malinar, K.-P. Gietz, A. Kollmann, P. Schreiner and M. Brockington edited, ‘Epic and Purāṇic Bibliography (up to 1985) annotated and with indexes, Part II S-Z, Indexes’; Wiesbaden: Otto Harrassowitz, 1992, pp. 1160-1170.
    2. Ludo Rocher, ‘The Purāṇas’; Wiesbaden: Otto Harrassowitz, 1986, pp. 228-237.
    3. R.C. Hazra, ‘Studies in the Purāṇic Records on Hindu Rites and Customs’; Dacca: The University of Dacca, 1940, pp. 157-166.